সংবাদ শিরোনাম

স্পেসএক্স রকেটের ধ্বংসাবশেষ চাঁদে আছড়ে পড়েছে

 প্রকাশ: ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৬ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

স্পেসএক্স রকেটের ধ্বংসাবশেষ চাঁদে আছড়ে পড়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

গত বছর মহাকাশে থেকে যাওয়া স্পেসএক্সের একটি ফ্যালকন-৯ রকেটের অংশ উচ্চগতিতে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। ঘটনাটি খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। টেলিস্কোপে পর্যবেক্ষণের পর এর আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় রয়েছেন গবেষকেরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনায় পৃথিবীর কোনো ঝুঁকি নেই। তবে সংঘর্ষের ফলে চাঁদের বুকে নতুন একটি গর্ত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল নাগাদ রকেটের প্রায় চার টন ওজনের দ্বিতীয় ধাপটি ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার ৬৯০ কিলোমিটার গতিতে চাঁদের পশ্চিম প্রান্তের আইনস্টাইন ক্রেটারে আঘাত হানে। সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ চন্দ্রধূলা উড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও পৃথিবী থেকে তা খালি চোখে দেখা কঠিন।

স্পেসএক্স জানিয়েছে, এটি পরিকল্পিত নয়; সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা।

চাঁদে আছড়ে পড়া অংশটি স্পেসএক্সের পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন-৯ রকেটের দ্বিতীয় ধাপ। রকেটটির নিচের অংশ উৎক্ষেপণের পর পৃথিবীতে ফিরে আসে, কিন্তু ওপরের অংশটি মহাকাশযানকে নির্ধারিত পথে এগিয়ে দেওয়ার কাজ শেষে মহাকাশেই থেকে যায়।

গত বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে দুটি চন্দ্রযান বহন করে ফ্যালকন-৯ উৎক্ষেপণ করা হয়। সাধারণত এমন মিশনের পর রকেটের দ্বিতীয় ধাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায় অথবা সমুদ্রে পড়ে। কিন্তু চাঁদমুখী ওই অভিযানে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হওয়ায় রকেটের অংশটি মহাকাশেই আটকে যায় এবং পরে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ভেসে বেড়াতে থাকে।

চলতি বছরের শুরুতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেন, অবশিষ্ট জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ হারানো রকেটের অংশটি এমন কক্ষপথে রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত চাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে গিয়ে শেষ হবে।

স্পেসএক্সের নাসা বিজ্ঞান মিশন বিভাগের পরিচালক জুলিয়ানা শেইম্যান বলেন, উচ্চশক্তির মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপকে নিরাপদ কক্ষপথে সরিয়ে দেওয়ার নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সৌর কার্যকলাপ ও মহাকর্ষীয় বলের সম্মিলিত প্রভাবে সেটির গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে চাঁদের দিকে চলে যায়।

নাসার মুখপাত্র জিমি রাসেল বলেছেন, এ ঘটনায় পৃথিবীর জন্য কোনো ধরনের হুমকি নেই। নাসা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য রকেটের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং সংঘর্ষস্থলও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আওতায় আনা হবে।

এই ঘটনা মহাকাশে জমে থাকা মানবসৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে ৪৬ হাজারের বেশি মহাকাশ ধ্বংসাবশেষ ঘুরছে, যেগুলোর মোট ওজন প্রায় ১৭ হাজার টন।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বায়ুমণ্ডলীয় রসায়নবিদ এলয়েজ মারাইসের মতে, রকেট উৎক্ষেপণের সময় নির্গত রাসায়নিক পদার্থ ও সূক্ষ্ম কণিকা ওজোন স্তয় ক্ষয় এবং জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মহাকাশ বর্জ্য শুধু কক্ষপথের নিরাপত্তার জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ।

নাসা ও স্পেসএক্স ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ ঠেকানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করছে। কারণ, নাসার বহুমূল্যের আর্টেমিস কর্মসূচির আওতায় এই দশকের শেষ দিকে চাঁদে স্থায়ী মানব উপস্থিতি গড়ে তোলা এবং নিয়মিত নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

চাঁদে মহাকাশযান বা রকেটের অংশ আছড়ে পড়ার ঘটনা খুব বেশি ঘটে না। ২০২২ সালে চীনের একটি রকেটের অংশ চাঁদে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এর আগে ২০০৯ সালে নাসা গবেষণার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রকেটের অংশ চাঁদে আঘাত করায়। ১৯৭০-এর দশকেও স্যাটার্ন-ভি রকেটের কয়েকটি ধাপ নিয়ন্ত্রিতভাবে চাঁদে ফেলে ভূকম্পীয় প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালানো হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি চন্দ্রযানও অবতরণের চেষ্টা করতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে রাশিয়ার লুনা-২৫, ২০১৯ সালে ভারতের চন্দ্রযান-২ এবং একই বছরে ইসরায়েলের বেরেশিট মিশন চাঁদের পৃষ্ঠে বিধ্বস্ত হয়।

বিজ্ঞানীদের আশা, স্পেসএক্সের রকেটের এই সংঘর্ষ থেকে চাঁদের পৃষ্ঠ, মহাকাশ ধ্বংসাবশেষের আচরণ এবং ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের নিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনাটি মহাকাশে ব্যবহৃত রকেট ও যন্ত্রাংশের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement