রুশ হামলায় ১৭ নিহত, ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে ইউক্রেন বিপর্যস্ত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং আশপাশের এলাকায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলে এত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।
ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, বুধবার ভোরের এই হামলার পর বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। কিয়েভের ব্রোভারি এলাকায় একাধিক গুদাম ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুচা শহরের আরেকটি গুদামে আগুন ধরে যায়।
জেলেনস্কির তথ্য অনুযায়ী, হামলায় রাশিয়া ২৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, চারটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১১৫টি ড্রোন ব্যবহার করেছে। তাঁর অভিযোগ, হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল বেসামরিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গুদাম, অবকাঠামো এবং একটি রেলস্টেশন। এসব স্থাপনার সঙ্গে সামরিক কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি ব্রুয়ারি, নির্মাণসামগ্রীর গুদাম এবং বেসামরিক লজিস্টিকস কেন্দ্রও রয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা থাকলে অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করা যেত। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের তুলনায় বর্তমানে ইউক্রেনে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ তিন গুণ কমে গেছে। তিনি পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি দ্রুত প্রতিরক্ষা সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ অভিযোগ করেন, রাশিয়া এখন পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঁর ভাষায়, এই যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে গুদাম, খাদ্যসংরক্ষণ কেন্দ্র, লজিস্টিকস হাব, শিল্পকারখানা এবং নির্মাণসামগ্রীর গুদাম নির্বিচারে আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
কিয়েভ থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক অড্রি ম্যাকঅ্যালপাইন জানান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী হামলায় ক্লাস্টার গোলাবারুদও ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজধানীতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্রের পরপর বিস্ফোরণে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে ‘এপিসেন্টর’ নামে একটি বড় খুচরা বিপণিবিতানও রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনের জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন নিয়ে নতুন আলোচনা চলছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা ইউক্রেনের ক্ষয়িষ্ণু প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কীভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। বিবেচনাধীন একটি প্রস্তাবে ইউক্রেনে কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি করে জার্মানিতে চূড়ান্ত সংযোজনের কথা বলা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে কম খরচের সংস্করণ তৈরির সুযোগ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের যৌথ প্যাট্রিয়ট কর্মসূচিতে ইউক্রেনকে যুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে বুধবার রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পাল্টা ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। তুলা অঞ্চলের আলেক্সিন শহরে রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের একটি বাছাই কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা হয়। স্থানীয় গভর্নর দিমিত্রি মিলিয়ায়েভ জানান, হামলায় দুটি আবাসিক ভবনসহ আরও কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াইল্ডবেরিজের একাধিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। কিয়েভের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা করছে।
রাশিয়ায় একটি ড্রোন কারখানার পরিচালকও গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন। এতে তাঁর চালক নিহত হন। বিস্ফোরণের কারণ নিশ্চিত না হলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার বিভিন্ন কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে ইউক্রেন একাধিক গাড়িবোমা হামলা চালিয়েছে।
মস্কো থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ইউলিয়া শাপোভালোভা জানান, ইউক্রেনের আরেকটি হামলায় বাশকোর্তোস্তানের উফা শহরের একটি তেল শোধনাগারেও আঘাত হানা হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের ৪৭৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই সঙ্গে ওডেসার কাছে তিনটি মালবাহী জাহাজেও হামলার কথা জানিয়েছে মস্কো। রুশ দাবি, এসব স্থাপনা সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ ছিল।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট দিয়েছে, যাতে সর্বোচ্চ ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার থাকতে পারে। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ইউনিটটি পশ্চিম রাশিয়ায় মোতায়েন করা হয়েছে।
জেলেনস্কি পশ্চিমা দেশগুলোকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জি–৭ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁর অভিযোগ, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে যুক্ত ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
কিয়েভে হামলার পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঘোষণা দিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: আলজাজিরা