সংবাদ শিরোনাম

ট্রাম্পের অবস্থান বদলে ইরানে বাড়ছে অনিশ্চয়তার চাপ

 প্রকাশ: ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের অবস্থান বদলে ইরানে বাড়ছে অনিশ্চয়তার চাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানকে ঘিরে কখনো যুদ্ধের হুমকি, কখনো আবার আলোচনার ইঙ্গিত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

তেহরানের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৭ বছর বয়সী ফায়েজেহ বলেন, কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই নতুন কোনো ঘোষণা দিচ্ছেন। কখনো ব্যাপক হামলার হুমকি, কখনো আলোচনার দাবি। এসবের দিকে তিনি আর তেমন মনোযোগ দেন না।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘তার বক্তব্য আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। তবে এই অনিশ্চয়তার পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে আমি এখন শুধু যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেগুলোর দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।’

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ছয় মাসের দিকে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক ইরানিই প্রতিদিনের যুদ্ধসংক্রান্ত খবর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, ক্রমাগত উদ্বেগের মধ্যে না থেকে মানসিকভাবে স্থির থাকাই এখন বেশি জরুরি।

ফায়েজেহর সহকর্মী রোহাম বলেন, আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা কম কথা বলতেন, বেশি কাজ করতেন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ট্রাম্প উল্টো বেশি কথা বলেন, কিন্তু তার বক্তব্য থেকে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তার মতে, কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানই নয়, ইরানের ভেতরেও মত প্রকাশের পরিসর সীমিত থাকায় মানুষের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবন যেন ঝুলে আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।’

ফায়েজেহর ভাষায়, ট্রাম্পের ঘোষণাগুলো অনেকটা একই ধরনের পুনরাবৃত্তি, যা বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এত দ্রুত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়া একজন নেতার মন্তব্যকে তিনি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সামনে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দেশটির মুদ্রার মান আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোমবার তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৯ লাখ ১০ হাজার রিয়াল লেনদেন হয়েছে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। জুনের মাঝামাঝি আঞ্চলিক মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতার পর রিয়ালের দর কিছুটা শক্তিশালী হলেও তা পরে আবার দুর্বল হয়ে পড়ে।

এদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, তিনি ইরানের মুদ্রার মান ধসিয়ে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশটিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথাও উল্লেখ করেন। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই শেষ হওয়া এক বছরে দেশটির মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।

তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবস্থাপক আলি মনে করেন, ট্রাম্প মূলত শেয়ারবাজার ও তেলের দামের দিকেই বেশি নজর রাখেন। তাই তার বক্তব্যের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রেও তিনি এসব সূচক পর্যবেক্ষণ করেন।

তার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা বা স্থল অভিযান চালানোর ঝুঁকি নেবেন না। তবে যুদ্ধ ও আলোচনার মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থান তিনি বজায় রাখবেন।

রোববার ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হচ্ছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির বিষয়ে আলোচনা করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো বৈঠক নির্ধারিত নেই।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের বহু বক্তব্যই অতীতে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। তাই সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, ইরান তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসবে না।

ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়ে তারা বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি যেকোনো সমঝোতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, যুদ্ধ আবার শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার পাশাপাশি অবকাঠামো ধ্বংস, অস্থিরতা সৃষ্টি ও সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ানোর মতো কৌশলও নিতে পারে।

এর মধ্যেই সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইরানের বৈদেশিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প আবারও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তবেই ইরানে পণ্য প্রবেশ করবে। তার ভাষায়, একটি সমঝোতা অথবা ‘পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ না হওয়া পর্যন্ত সেই অবস্থান বহাল থাকবে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement