তেলের দাম চাপে মার্কিন পরিবার, মুনাফায় তেল কোম্পানিগুলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আয়ের বড় অংশ জ্বালানি কিনতেই ব্যয় করছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলোর রেকর্ড মুনাফা নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমার এটা ভালো লাগছে না। শেভরন অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করছে। এক্সনমোবিলও তাই। অতিরিক্ত মুনাফা করছে তারা।’ ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কয়েক মাস ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইক ওয়ার্থ ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোম্পানির সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। পরে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, তাঁর প্রশাসনের নীতিগত সহায়তা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্প এতটা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না।
গত শুক্রবার শেভরন জানায়, গত ছয় বছরের মধ্যে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তারা সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে। কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ ডলার এবং মোট মুনাফা হয়েছে ১২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এ মুনাফার অন্যতম কারণ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রেকর্ড মুনাফার পর শেভরন অধিকাংশ কর্মীকে তাদের এক মাসের মূল বেতনের অর্ধেক সমপরিমাণ বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আল জাজিরা।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পোস্ট ওক গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক বিল ড্রোলেটের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল হওয়ায় শেভরন বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা বেশি পেয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির ৭০ শতাংশের বেশি উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় সেখান থেকেই তারা সর্বোচ্চ মুনাফা করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তনের ফলে ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদনের সুযোগও শেভরনের আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে। যদিও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোম্পানিটি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
শুধু শেভরন নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী এক্সনমোবিলও দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম ছিল এই আয়। আর ভ্যালেরো এনার্জি দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফার ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে তেলের উচ্চমূল্যের চাপ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম এখন ৪ দশমিক ৯ ডলার। এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ৪ দশমিক ১১ ডলার এবং এক মাস আগে ছিল ৩ দশমিক ৮২ ডলার। অথচ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার সময় গড় দাম ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯৮ ডলার।
ব্যাংক অব আমেরিকার এপ্রিলের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চে মার্কিন ভোক্তারা গড়ে তাদের আয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ পেট্রল কিনতে ব্যয় করেছেন। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর অবস্থা আরও কঠিন। তাদের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি পরিবার মাসিক আয়ের ১০ শতাংশেরও বেশি শুধু পেট্রল কিনতেই ব্যয় করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুতও কমে এসেছে। দেশটির জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মজুত ৩০ কোটি ৪৮ লাখ ব্যারেলে নেমেছে, যা ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন।
তেল কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ে সমালোচনা শুধু রিপাবলিকান শিবিরে নয়, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও রয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেলডন হোয়াইটহাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই মুনাফা প্রকৃত আয় নয়, বরং বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগে পাওয়া অতিরিক্ত লাভ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে তেলের দাম কমানো কোম্পানিগুলোর জন্য সহজ নয়। কারণ তারা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় আইনগতভাবে বাধ্য। বিল ড্রোলেটের পরামর্শ, ভোক্তাদের দ্রুত স্বস্তি দিতে অঙ্গরাজ্যভেদে আরোপিত জ্বালানি কর সাময়িকভাবে স্থগিত করা যেতে পারে। তাঁর মতে, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো রাজ্যে এ পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। গত মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোসের এক জরিপে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
ট্রাম্পের সমালোচনার পর সোমবার দিনের লেনদেনে শেভরনের শেয়ারের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে যায়। তবে গত পাঁচ কার্যদিবসের হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ার এখনো ১ শতাংশের বেশি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এক্সনমোবিলের শেয়ারও দিন শেষে সামান্য দরপতনের মুখে পড়ে।
সূত্র: আলজাজিরা