সংবাদ শিরোনাম

জনপ্রিয়তার পরীক্ষায় ট্রাওরে, বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে

 প্রকাশ: ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

জনপ্রিয়তার পরীক্ষায় ট্রাওরে, বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

২০২২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বুরকিনা ফাসোর সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে এখন আফ্রিকার সবচেয়ে আলোচিত নেতাদের একজন। বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান, জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে বক্তব্য এবং আত্মনির্ভরশীলতার আহ্বানে তিনি মহাদেশজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তবে দেশের ভেতরে তাঁর শাসন নিয়ে প্রশ্নও ক্রমেই বাড়ছে।

৩৮ বছর বয়সী ট্রাওরে সমর্থকদের কাছে স্বাধীনচেতা নেতৃত্বের প্রতীক হলেও তাঁর সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সামরিক শাসনের কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

এ বছরের এপ্রিলে ট্রাওরে দেশবাসীকে ‘গণতন্ত্র ভুলে যেতে’ আহ্বান জানিয়ে বলেন, বুরকিনা ফাসো এখন গণতান্ত্রিক নয়, বরং একটি ‘বিপ্লবী পর্যায়ে’ রয়েছে। এর আগে তাঁর সরকার সামরিক অন্তর্বর্তী শাসনের মেয়াদ বাড়ায় এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এতে বেসামরিক শাসনে দ্রুত ফেরার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

প্রায় এক দশক ধরে সাহেল অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বুরকিনা ফাসো। আল-কায়েদা ও আইএস-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে এবং একের পর এক সরকার তাদের দমনে ব্যর্থ হয়েছে।

ট্রাওরের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ, তিনি আফ্রিকার বহু মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছেন। ক্ষমতায় এসে তিনি ফরাসি সেনা প্রত্যাহার করেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন, স্থানীয় শিল্প ও কৃষিতে গুরুত্ব বাড়ান এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতাকে রাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।

তিনি প্রায়ই ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বুরকিনা ফাসো শাসন করা বিপ্লবী নেতা থমাস সানকারার আদর্শের কথা উল্লেখ করেন। আফ্রিকাজুড়ে সানকারা এখনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।

নাইজেরিয়াভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাবির আদামু আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাওরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকারিতার পরিবর্তে সার্বভৌমত্বের ধারণার ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মতে, পশ্চিমা সমর্থিত সামরিক উদ্যোগের দীর্ঘ ব্যর্থতার পর ট্রাওরের এই অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

ঘানায় দায়িত্ব পালন করা বুরকিনা ফাসোর এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বহু নাগরিক ট্রাওরেকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি বাইরের শক্তির নির্দেশনা মেনে চলেন না। পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাকেও তাঁর সমর্থকেরা স্বাধীন অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখেন।

ক্ষমতায় এসে ট্রাওরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয় শিল্প বিকাশ এবং কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকার বলছে, এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি গড়ে তুলবে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে ‘ভলান্টিয়ার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য হোমল্যান্ড’ কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

তবে ট্রাওরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ক্ষমতা গ্রহণের সময় তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সরকার দাবি করছে, বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান চালিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পুনর্দখল করেছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

কিন্তু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা বাতুরে সাল্লামার মতে, বাস্তবতা এখনো জটিল। জামাআত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং আইএসের পশ্চিম আফ্রিকা শাখা এখনো বড় হুমকি হয়ে রয়েছে। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং লাখো মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি দাবির স্বাধীন যাচাইও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারের অগ্রগতির দাবি সত্ত্বেও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রয়েছে। বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে নিয়মিত। সংঘাতপ্রবণ এলাকায় সাংবাদিক, গবেষক ও মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশ সীমিত হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাইও কঠিন হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ট্রাওরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। সরকারের দাবি, জাতীয় সংকটের সময় বিভাজন এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ধর্মীয় ক্ষেত্রেও সরকারের কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। নতুন ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন কার্যকর হওয়ার পর কয়েকজন সুন্নি আলেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ট্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে কিছু মুসলিম আলেমের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার আরও সংকুচিত হতে পারে। তবে সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের ওপর বাড়তি বিধিনিষেধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাওরের রাজনৈতিক উত্থান সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার শক্তিশালী বার্তার ওপর দাঁড়িয়ে। আফ্রিকার অনেক মানুষের কাছে তিনি এমন এক নেতা, যিনি সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন এবং দেশের সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন।

তবে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে প্রতীকী সাফল্যের বাইরে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বদলাতে পারেন তার ওপর। নিরাপত্তা, মানবিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

ওয়াগাদুগুর এক যুবনেতা, নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে, আল জাজিরাকে বলেন, ‘পশ্চিমাদের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তুলে ধরা এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা একজন নেতাকে দেখে আমরা গর্বিত। কিন্তু শুধু গর্বে পরিবারের ভরণপোষণ হয় না, কোনো গ্রামও নিরাপদ থাকে না। আমরা চাই, ক্যাপ্টেন ট্রাওরে শুধু শক্তির প্রতীক নন, নিজের দেশের মানুষের জন্য নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারেরও প্রতীক হয়ে উঠুন।’

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement