হামাস নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের গুরুতর আপত্তি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ’ তুলে ধরেছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বলেছেন, হামাস প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে আবারও সামরিক শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন।
রোববার বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পিলম্যান বলেন, হামাস পুরোপুরি অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। বর্তমানে গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণের আগেই সেনা সরিয়ে নেওয়া হলে সংগঠনটি দ্রুত গাজাজুড়ে আবারও নিজেদের উপস্থিতি বাড়াবে, সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করবে এবং ইসরায়েলের জন্য নতুন নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করবে। তাঁর ভাষায়, ‘নিরস্ত্রীকরণ বলতে সব অস্ত্র বাস্তবে সমর্পণ করাকে বোঝায়। এর কম কিছু গ্রহণযোগ্য নয়।’
কয়েক দিন আগে হামাস জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে তারা ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত। প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘাতের অবসানে এটিকে সম্ভাব্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও এখনো বহু শর্ত ও জটিলতা রয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনায় হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস, গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, একটি প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং গাজার পুনর্গঠনের রূপরেখা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই হামাসের নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার বিষয় ছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি সুপরিকল্পিত ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
চুক্তির একটি অনুলিপির তথ্য অনুযায়ী, গাজায় নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর হামাস-নিয়ন্ত্রিত পুলিশের সব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’র কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের সঙ্গে সমন্বয় করে ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ, অস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র ও সুড়ঙ্গ ধ্বংসের কাজ শুরু হবে। একই সময়ে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও জনশূন্য। অপর অংশে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনির অধিকাংশই ধ্বংসস্তূপ বা অস্থায়ী তাঁবু শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ইসরায়েল বড় ধরনের সামরিক ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কঠিন নির্বাচনি লড়াইয়ের মুখে রয়েছেন। বিরোধীরা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলছে, আর তাঁর কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীরা হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা এবং গাজায় সেনা মোতায়েন বজায় রাখার দাবি জানাচ্ছে।
স্পিলম্যান বলেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও স্থায়ী সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে। তবে তাদের কাছে থাকা গোয়েন্দা তথ্য বলছে, হামাস এখনো নতুন যোদ্ধা নিয়োগ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের দাবি, ইসরায়েল তাদের উদ্বেগ ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্য ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছেও তুলে ধরেছে। তাদের অন্যতম দাবি, প্রয়োজনে গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। দক্ষিণ গাজার একটি আবাসিক ভবনে হামলায় একই পরিবারের তিন সদস্য, যার মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও ছিল, নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের সামরিক সদস্যরা। তবে এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।