হুথি এলাকায় টিকার সংকট, ঝুঁকিতে পঞ্চাশ লাখ শিশু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৫০ লাখ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকার। পরিস্থিতিকে সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে উল্লেখ করে জীবনরক্ষাকারী টিকা পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, টিকাদান কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের বাধা এবং মানবিক সংস্থাগুলোর কাজে হস্তক্ষেপের কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যবধান বাড়ছে। এর ফলে পোলিও, হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা সংক্রামক রোগ আবারও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তায় বলা হয়, টিকাদানে বাধা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; জনস্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিবেশী দেশগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এ সতর্কতার মধ্যেই হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শিশুদের টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকার পর এখন মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও টিকার সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইয়েমেনকে প্রায় তিন দশক আগে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হলেও সম্প্রতি হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আবারও পোলিও রোগী শনাক্ত হয়েছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার আগে হুথি-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম ও মসজিদের খুতবায় টিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়। সেখানে টিকাকে ‘পশ্চিমা ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচার করে অভিভাবকদের সন্তানদের টিকা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকেও টিকা কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রতিটি শিশুর টিকা পাওয়া মৌলিক অধিকার। শিশুমৃত্যু কমানো এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগ ঠেকাতে টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোর একটি। তাই টিকাকে রাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শিশুদেরই।
মন্ত্রণালয়ের মতে, হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পেছনে রয়েছে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে ধারাবাহিক বাধা, স্বাস্থ্যকর্মীদের চলাচলে সীমাবদ্ধতা, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীদের আটকের ঘটনা। এসব কারণে অনেক স্বাস্থ্য ও ত্রাণ কার্যক্রম সীমিত বা স্থগিত করতে হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য অংশীদারদের মাধ্যমে ইয়েমেনের সব প্রদেশের জন্য, হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাসহ, পর্যাপ্ত টিকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু টিকা গ্রহণ, পরিবহন ও বিতরণে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে সেগুলো শিশুদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), গ্যাভি—দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের সব শিশুর কাছে বৈষম্যহীনভাবে টিকা পৌঁছে দিতে প্রস্তুত থাকার কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে টিকা পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিনা মূল্যে বিতরণের নিশ্চয়তা চেয়েছে।
এ ছাড়া সানা ও হুথি-নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা, টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্তকারী প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদ ও বাধাহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচির স্বাধীন কারিগরি তদারকি, টিকার মজুত ও বিতরণে পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং আটক জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থার কর্মীদের মুক্তি দিয়ে স্বাস্থ্য ও ত্রাণ কার্যক্রম পুরোপুরি পুনরায় চালু করার দাবি জানানো হয়েছে।
সরকারের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, টিকাদান কার্যক্রম দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকলে পোলিও, হাম, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও ধনুষ্টঙ্কারের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবারও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইয়েমেন সরকার। গত মাসে শিশু ও মায়েদের জন্য ২৮ লাখের বেশি টিকার ডোজ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে পোলিও, হাম, রোটাভাইরাসসহ বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগের টিকা রয়েছে।
ইউনিসেফও জানিয়েছে, টিকাদান মানুষের জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করতে টিকার ধারাবাহিক প্রাপ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।