ট্রাম্পের পরিকল্পনার মধ্যেও গাজায় প্রাণ গেল উনিশজনের

 প্রকাশ: ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের পরিকল্পনার মধ্যেও গাজায় প্রাণ গেল উনিশজনের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনার ঘোষণা দিলেও ইসরায়েলি হামলা থামেনি। রোববার ভোর থেকে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আবাসিক ভবন, বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে হামলায় আবদুল্লাহ আবু তাইফ (৩৩), তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান (২৯) এবং তাঁদের পাঁচ বছরের ছেলে আজ্জাম নিহত হন। আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

খান ইউনিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-কারারা এলাকায় একটি বাড়িতে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন। নিহতরা হলেন মাহমুদ আল-হামস (৩৮), তাঁর স্ত্রী ফাতিমা (৩৭) এবং তাঁদের কন্যাশিশু। এ হামলায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে নাসের হাসপাতাল জানিয়েছে।

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় নিজ বাড়িতে হামলায় কামু আবু মুয়াইলিক (৬৮) ও তাঁর স্ত্রী হুদা আবু মুয়াইলিক (৫৯) নিহত হন। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ভাইও পৃথক হামলায় প্রাণ হারান।

উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে একজন ফিলিস্তিনি সরাসরি হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি তাঁবুতে হামলায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের রিমাল এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হন। একই শহরে একটি গাড়িতে হামলায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।

এর এক দিন আগে দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণাগারে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, ওষুধের মজুত ধ্বংস করে চিকিৎসাসেবাকেই যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, দুটি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং আরও দুটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জানান, হামলার মাত্র ১৫ মিনিট আগে এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিস্ফোরণে বিশাল গর্ত তৈরি হয় এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় নেওয়া বহু তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সরে যেতে হয়েছে।

গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন স্থানে নিচু দিয়ে উড়ে আসা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান একাধিক হামলা চালায়। স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাসিন্দাদের আগাম সতর্কবার্তা বা নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। হামলার লক্ষ্য ছিল আবাসিক ভবন, ফ্ল্যাট ও সাধারণ মানুষের জটলা। ইসরায়েলের দাবি, এসব স্থানে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অবস্থান করছিল।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের বিষয়ে সমঝোতার ঘোষণা দেয়। সংস্থাটির দাবি, হামাস এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত রূপরেখা গ্রহণ করেছে। তবে এ প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানায়নি।

গাজার বাসিন্দাদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও ইসরায়েলি হামলা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকায় বাস্তবে এই যুদ্ধবিরতির কোনো কার্যকারিতা নেই। তাঁদের মতে, আগের চুক্তিগুলোর মতো এটিও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২২২ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক মোহানাদ মুস্তাফা বলেন, ইসরায়েল সাধারণত আন্তর্জাতিক চুক্তিকে নিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রয়োগ করে এবং প্রয়োজনে তা লঙ্ঘনের পথও বেছে নেয়। তাঁর মতে, ইসরায়েলের অবস্থান পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের চাপই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্রভাবক।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত রূপরেখা নিয়ে ইসরায়েল আপত্তি তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান জানান, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরায়েল। তাদের আশঙ্কা, হামাস অস্ত্র জমা দেওয়ার পরিবর্তে আবারও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ইসরায়েল আরও চেয়েছে যাতে প্রয়োজনে গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বজায় থাকে। পাশাপাশি কাতার ও তুরস্কের তদারকি ভূমিকা এবং হামাসের কাছ থেকে জব্দ করা অস্ত্র ধ্বংস না করে সংরক্ষণের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে তেল আবিব।

অন্যদিকে হামাস অভিযোগ করেছে, মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা ভেস্তে দিতেই ইসরায়েল হামলা বাড়িয়েছে। সংগঠনটি যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টিদাতা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হামলা বন্ধ এবং চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে।

গাজার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীরা সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement