কাটজের সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রকাশ্য ক্ষমতার সংঘাত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ পশ্চিম তীরের আইডিএফ সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ শুরু হয়েছে। টেলিভিশনে দেওয়া এই ঘোষণার পরপরই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়ে দেয়, ব্লুথ আপাতত তাঁর দায়িত্বেই বহাল থাকবেন।
ডানপন্থী চ্যানেল–১৪-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাটজ অভিযোগ করেন, সহিংস বসতি স্থাপনকারী তাল ইয়িনন দারদিকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা নবায়নের উদ্যোগ নিয়ে ব্লুথ তাঁর ঘোষিত নীতির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর পশ্চিম তীরের কমান্ডারকে সরকারের নীতি অনুসরণ করতেই হবে।
দারদিকের বিরুদ্ধে গত মার্চে পশ্চিম তীরের খিরবেত হুমসা গ্রামে এক ফিলিস্তিনির ওপর নৃশংস হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার সময় ভুক্তভোগীকে বিবস্ত্র করা, তাঁর শরীরে নির্যাতন চালানো এবং গ্রামজুড়ে ঘোরানো হয়। তবে দারদিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে নিজ বসতিতে ফিরে যাওয়ায় দারদিককে আটক করা হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি কারাগারে অনশন করছেন। জুলাইয়ের শেষ দিকে কাটজ নিজে কারাগারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, যা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে দারদিকের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করছে। কট্টর ডানপন্থী আইনপ্রণেতা লিমোর সন হার-মেলেখও প্রকাশ্যে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
কাটজ জানান, এক সপ্তাহ আগে কারিগরি কারণে দারদিকের নিষেধাজ্ঞা বাতিল হওয়ার পর তিনি সেটি নবায়ন না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্লুথ ও সামরিক আইন বিভাগ আদালতে আপিল করে তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, এটি তাঁর নীতির পরিপন্থী পদক্ষেপ।
সাক্ষাৎকারেই কাটজ ঘোষণা দেন, সেন্ট্রাল কমান্ডের নতুন প্রধান হিসেবে তিনি আইডিএফ পার্সোনেল ডিরেক্টরেটের প্রধান মেজর জেনারেল দাদো বার কালিফাকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর দাবি, পশ্চিম তীরে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা শত্রুর বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেবে এবং বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ‘সম্পূর্ণ’।
তবে কাটজের ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই আইডিএফ জানিয়ে দেয়, সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামিরের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো সমন্বয় করা হয়নি। বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ব্লুথকে সরানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানায় সেনাবাহিনী। ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত হলে তা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নেওয়া হবে।
আইডিএফের বিবৃতিতে বলা হয়, জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে ব্লুথ পেশাদারিত্ব, সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তিনি সেনাপ্রধানের পূর্ণ আস্থা ভোগ করছেন।
কাটজের ঘোষণার পর বিরোধী নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট একে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্কের ইতিহাসে নজিরবিহীন নিম্নগামী ঘটনা বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সরকার নিজ দেশের সেনাবাহিনীকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, বাইরের চাপের পর এবার ভেতর থেকেও আইডিএফকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী আইনপ্রণেতা লিমোর সন হার-মেলেখ কাটজের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ব্লুথ তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সন্ত্রাস দমনের বদলে ব্লুথ বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধেই বেশি কঠোর ছিলেন।
পরে কাটজের দপ্তর জানায়, সেনাপ্রধান জামির কয়েক মাস আগেই বার কালিফার নাম সেন্ট্রাল কমান্ডের পরবর্তী প্রধান হিসেবে সুপারিশ করেছিলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেই সুপারিশ গ্রহণ করেছেন এবং পরবর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে তা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, কাটজ ও সেনাপ্রধান জামিরের মধ্যে এর আগেও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়ে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই বিরোধ মিটলেও নতুন এই ঘটনায় আবারও ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সামনে চলে এসেছে।