ট্রাম্প পিছু হটলেন, হরমুজে অচলাবস্থা কাটেনি এখনো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি থেকে আপাতত সরে দাঁড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বহাল রয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, রোববার দুপুর পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির উত্তর দিকের করিডোরে ইরানের জলসীমায় বহু জাহাজ আটকে ছিল। দেশটির দাবি, সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ ওই পথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। একই অবস্থান দক্ষিণের সমুদ্র করিডোর নিয়েও, যা ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে।
হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ইরান ও অঞ্চলের কয়েকটি দেশের অনুরোধের পর সম্ভাব্য একটি সমঝোতার রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সেই সমঝোতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান ঘটবে।
তবে ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল মাজিদ এবন-এ-রেজা ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ এবং ‘হিসাব-নিকাশের লড়াই’-এর অংশ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি হুমকিকেই বাস্তব হিসেবে বিবেচনা করে। তাই তারা কখনো অপ্রস্তুত থাকবে না, আবার নিষ্ক্রিয়ও থাকবে না।
এর আগে ইরানের যুদ্ধকালীন সামরিক কমান্ড সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে পাল্টা জবাবে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ট্রাম্প হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি উত্তেজনা কমাতে সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর আগে শনিবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও কথা বলেন।
তেহরানের অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, ট্রাম্প এর আগেও কঠোর হুমকি দিয়ে পরে অবস্থান বদলেছেন। পশ্চিম তেহরানের বাসিন্দা রানা আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক হুমকিকে তিনি খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। তবে আবারও শহরাঞ্চলে হামলা হতে পারে—এই আশঙ্কা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, তা এক মাসও টেকেনি। ওই সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ শিথিল এবং তেলের নিষেধাজ্ঞায় দুই মাসের ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালির আংশিক চলাচল পুনরায় চালু করেছিল। পরে সেই সমঝোতার সব শর্ত কার্যত বাতিল হয়ে যায় এবং আবারও সামরিক হামলা শুরু হয়।
ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ওই সমঝোতা অনুযায়ী দক্ষিণ করিডোর দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু তেহরানের বক্তব্য, জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হাতেই থাকবে। এরপর থেকে ওমান উপকূলসংলগ্ন ওই পথ ব্যবহার করতে যাওয়া একাধিক জাহাজে আইআরজিসি হামলা চালায় বা সেগুলোকে ফিরিয়ে দেয়।
সংঘাতের প্রভাব লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ লক্ষ্য করেও অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে রোববার বড় ধরনের নতুন কোনো হামলা না হওয়ায় অঞ্চলটি তুলনামূলক শান্ত ছিল।
যুদ্ধ শুরুর আগেই দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপে ছিল। বর্তমানে সরকার তীব্র বাজেট সংকটে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো বেতন পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের সময় ফোনে খোঁজ নিচ্ছেন কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা চলতি মাসের বেতন পাননি।
অন্যদিকে, মার্চে নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হরমুজ ইস্যুর চলমান সংকটের মধ্যে এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। তেহরান সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট দৈনিক হামশাহরি জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণেই তাঁর অনুপস্থিতি বজায় রাখা হয়েছে। এমনকি কণ্ঠবার্তা প্রকাশ করলেও শত্রুপক্ষ অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে তেহরানের কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য আলি খেজরিয়ান বলেছেন, ভবিষ্যৎ বিমান হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় ইরানের উচিত ভূগর্ভস্থ ‘গভর্ন্যান্স সিটি’ নির্মাণ করা, যাতে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিরাপদে রাখা যায়।