বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসায় বড় কড়াকড়ি: গ্রেস পিরিয়ড বাতিল, বাড়ছে নজরদারি
অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারত কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং উন্নত চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও ভ্রমণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং জনপ্রিয় গন্তব্য। প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রয়োজনে ভিসা নিয়ে ভারতের সীমান্ত পাড়ি দেন। দীর্ঘদিনের এই যাতায়াতের চেনা সমীকরণে এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি দর্শনার্থী ও চিকিৎসা-প্রার্থীদের জন্য ভিসার নিয়মে এক যুগান্তকারী ও কঠোর পরিবর্তন এনেছে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স রুলস, ২০২৫' সংশোধন করে সম্প্রতি এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে, যা নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক মহলসহ সাধারণ ভ্রমণকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
হঠাৎ করে ভিসা নিয়মে এমন কঠোর পদক্ষেপের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার কৌশলগত কিছু বড় কারণ রয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির অভ্যন্তরে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর রিয়েল-টাইম নজরদারি জোরদার করা এবং ভিসা ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহার রোধ করতেই এই আইনি সংশোধন আনা হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে, অনেক বিদেশি নাগরিকই বিশেষ করে ট্যুরিস্ট বা মেডিকেল ভিসায় ভারতে প্রবেশ করে নির্ধারিত সময়ের তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অবস্থান করছেন। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং এভাবে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া বিদেশিদের নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতেই মোদি সরকার এই আইনি সংস্কারের পথে হেঁটেছে।
নতুন এই আইনি পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসতে যাচ্ছে মূলত যারা দীর্ঘমেয়াদি বা জটিল চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থান করেন, সেইসব মেডিকেল ভিসাগ্রহীতাদের ওপর। আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে প্রবেশ করার পর একটানা ১৮০ দিন থাকার পরও ইমিগ্রেশনে নিবন্ধন করার জন্য আরও ১৪ দিনের একটি অতিরিক্ত সময় বা 'গ্রেস পিরিয়ড' পেতেন। এই বাড়তি সময়টুকুর কারণে অনেকেই চিকিৎসার মাঝপথে কিছুটা স্বস্তি পেতেন। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে সেই ১৪ দিনের অতিরিক্ত সময় বা সুযোগটি পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এখন থেকে ১৮০ দিনের হিসাব শতভাগ নিখুঁতভাবে গণনা করা হবে। নতুন নিয়ম স্পষ্ট করে বলছে যে, কোনো বিদেশি নাগরিক যদি ভারতে ১৮০ দিনের বেশি অবস্থান করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে যাবতীয় আইনি নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ভারত সরকার কঠোরভাবে জানিয়ে দিয়েছে, অত্যন্ত বিশেষ বা জীবন-মরণ সংক্রান্ত জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি ছাড়া এখন থেকে ১৮০ দিনের বেশি অবস্থানের অনুমতি কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না।
আইন কঠোর করার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও হয়রানি কমাতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে ডিজিটাইজেশনের ওপর ব্যাপক জোর দিয়েছে ভারত সরকার। এর ফলে নিয়ম কঠোর হলেও বিদেশি নাগরিকেরা কিছু ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সুবিধাও পাবেন। যেমন, কোনো বিদেশি নাগরিকের ভিসা বা ভারতে অবস্থান নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে, তাকে আর আগের মতো সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হবে না। তিনি এখন সরাসরি ঘরে বসেই ব্যুরো অব ইমিগ্রেশনের গভর্নরের কাছে অনলাইনে আপিল করতে পারবেন। অতীতে এই ধরনের আপিল নিষ্পত্তি হতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেত, যার ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকত না। তবে নতুন সংশোধনীতে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ দিনের একটি কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই যেকোনো আপিল নিষ্পত্তি করার আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, ভারতে বিদেশি দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নিয়মটিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও মানবিক করা হয়েছে, যা অনেক পরিবারের জন্যই বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, যদি ভারতে জন্ম নেওয়া কোনো নবজাতক শিশুর বাবা অথবা মায়ের মধ্যে যেকোনো একজন ভারতীয় নাগরিক হন এবং শিশুটি ভারতের নাগরিকত্ব বজায় রাখে, তবে ইমিগ্রেশন দপ্তরে গিয়ে তার জন্য আলাদা করে জন্ম নিবন্ধনের কোনো বাড়তি বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এই সিদ্ধান্তটিকে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ভারতের এই নতুন ভিসা নীতি ও ইমিগ্রেশন আইনের সংস্কার দুই দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কেমন প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়। একদিকে যেমন অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের চিহ্নিত করা সহজ হবে, অন্যদিকে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে যাওয়া হাজার হাজার বাংলাদেশিকে এখন থেকে দিন ক্ষণ গুনে অনেক বেশি সতর্কতার সাথে তাদের ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজাতে হবে।