রটারডামে মধ্যরাতে মসজিদে তাণ্ডব: পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে উত্তপ্ত নেদারল্যান্ডস

 প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ০৬:০৯ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

রটারডামে মধ্যরাতে মসজিদে তাণ্ডব: পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে উত্তপ্ত নেদারল্যান্ডস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইউরোপের অন্যতম শান্ত ও সহনশীল দেশ হিসেবে পরিচিত নেদারল্যান্ডসে উগ্রবাদের এক নতুন এবং উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশটির অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী রটারডামের ঐতিহাসিক ‘মেভলানা মসজিদে’ মধ্যরাতে একদল অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের আকস্মিক হামলা, ভাঙচুর ও চরম অবমাননাকর আচরণে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। ঘটনার ভয়াবহতার চেয়েও বেশি আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে ঘটনার সময় স্থানীয় পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা এবং উদাসীন ভূমিকা নিয়ে।

তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১০টা ৪০ মিনিটে এই ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে। মেভলানা মসজিদ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ছয়জন অজ্ঞাতপরিচয় উগ্রপন্থী যুবক হঠাৎ করেই মসজিদ প্রাঙ্গণে চড়াও হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুবকদের দলটি প্রথমে মসজিদের প্রধান ফটকের সামনে এসে চিৎকার করে উসকানিমূলক ও বর্ণবাদী স্লোগান দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা মসজিদের অত্যন্ত সুন্দর ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত একটি মোজাইক দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তাদের হাতে থাকা বিয়ারের বোতলগুলো তারা মসজিদের মূল ভবনের দেয়াল ও জানালা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে। এখানেই শেষ নয়, হামলাকারীরা মসজিদের পবিত্রতা পদদলিত করে ভবনের সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে চরম অশোভন আচরণ করে এবং সেখানে মূত্রত্যাগ করে বীরদর্পে স্থান ত্যাগ করে।

এই পুরো তাণ্ডব চলাকালীন মসজিদ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে এখন ডাচ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় বইছে। মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার শুরুতেই তারা পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে একাধিকবার ফোন করেন। তারা পুলিশকে জানান যে এটি একটি পরিকল্পিত এবং সাম্প্রদায়িক হামলা হতে যাচ্ছে এবং এর ফলে যেকোনো মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটতে পারে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বারবার আকুল আবেদন জানানো সত্ত্বেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। উগ্রপন্থী হামলাকারীরা প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে নির্বিঘ্নে তাণ্ডব চালিয়ে, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার বেশ কিছু সময় পর পুলিশের একটি দল সেখানে এসে উপস্থিত হয়। ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে।

এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ডসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠন ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন নেদারল্যান্ডস’ (আইএসএন)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করা হয়েছে, যেখানে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। আইএসএন স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, ঘটনাস্থলে যে পুলিশ সদস্যরা এসেছিলেন, তারা পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত হালকাভাবে নিয়েছেন। একজন সাধারণ নাগরিকের বাড়িতে হামলা হলে পুলিশ যেভাবে তৎপরতা দেখায়, একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার পরও তারা এর মধ্যে কোনো ‘জরুরি নিরাপত্তা হুমকি’ খুঁজে পাননি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বৈষম্যমূলক।

আইএসএনের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেদারল্যান্ডসসহ পুরো ইউরোপ জুড়েই ইসলামভীতি বা ‘ইসলামোফোবিয়া’ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একের পর এক মুসলিম সম্প্রদায় ও মসজিদগুলোকে লক্ষ্য করে সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মুসল্লিরা এখন প্রতিদিনের নামাজ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে চরম এক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সংস্থাটি ডাচ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আইএসএন এবং মেভলানা মসজিদ কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার বিষয়ে চুপ করে বসে নেই। ইতিমধ্যেই তারা রটারডাম পুলিশ বিভাগের কাছে সিসিটিভি ফুটেজসহ একটি আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। তারা দাবি করেছে, এই ঘটনার পেছনে কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি এই মামলাটিকে একটি সাধারণ ভাঙচুরের মামলা হিসেবে না দেখে ‘ঘৃণামূলক অপরাধ’ বা ‘হেট ক্রাইম’ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত ও অগ্রাধিকারভিত্তিতে তদন্ত শেষ করতে হবে। রটারডামের স্থানীয় মুসলিম নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হলে এবং মুসলমানদের সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তারা রাজপথে শান্তিপূর্ণ ও বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

সূত্র: তুর্কি বার্তা সংস্থা ‘আনাদোলু এজেন্সি’ (Anadolu Agency)

Advertisement
Advertisement
Advertisement