সফল হজ শেষে প্রথম ফিরতি ফ্লাইটে দেশে ফিরলেন ৫ হাজারেরও বেশি হাজি
অনলাইন ডেস্ক:
পবিত্র হজের সব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও পুণ্যময় ইবাদত সফলভাবে সম্পন্ন করে পরম শান্তির অনুভূতি নিয়ে অবশেষে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন বাংলাদেশি হাজিরা। শুক্রবার দিবাগত রাত থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ফিরতি হজ ফ্লাইট। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইট এসভি-৫৮০৬ যোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে প্রথম যাত্রা শুরু করেন হাজিরা। বিমানের চাকা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথেই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রথম দিনেই সাউদিয়া ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মোট ১৩টি ফ্লাইটে পাঁচ হাজার ৪৩৪ জন হাজি নিরাপদে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করছেন। প্রিয়জনদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর এলাকায় হাজির হন স্বজনরা, যাদের চোখে-মুখে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ এবং আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা।
এর আগে গত ১৭ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক হজ ফ্লাইট কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রী বহনকারী সর্বশেষ ফ্লাইটটি সৌদি আরবে পৌঁছায় ২১ মে। চলতি বছরের ফিরতি হজ ফ্লাইটের এই মহাযজ্ঞ আগামী ১ জুলাই পর্যন্ত টানা চলবে বলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এবারের হজের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি গোছানো এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ। সৌদি সরকারের বেঁধে দেওয়া সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই হজযাত্রীদের মিনা ও আরাফাতের তাঁবু ভাড়া করা, উন্নত পরিবহন চুক্তি সম্পাদন, মক্কা-মদিনায় মানসম্মত আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুততম সময়ে ভিসা প্রক্রিয়াসহ সব ধরনের জটিল প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করেছিল ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। একই সাথে হজযাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সাউদিয়া এবং ফ্লাইনাসের মতো সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে কয়েক দফায় সমন্বয় সভা করে প্রয়োজনীয় আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে ফ্লাইটের কোনো ধরনের বড় সময়সূচি বিপর্যয় বা শিডিউল বিপর্যয় ছাড়াই নিবন্ধিত শতভাগ হজযাত্রী অত্যন্ত স্বস্তির সাথে যথাসময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হজের পবিত্র ও কঠিন আনুষ্ঠানিকতা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর মক্কায় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মহান আল্লাহর অশেষ রহমত, দয়া ও কুদরতের কারণেই এবারের হজ অত্যন্ত সফল ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বিনয়ের সাথে উল্লেখ করেন যে, এই বিশাল সফলতার কৃতিত্ব একক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং এটি সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ইচ্ছার প্রতিফলন। ধর্মমন্ত্রী জানান, হজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক দল, প্রশাসনিক টিম, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং হজ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষ দিন-রাত আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই হাজিদের সেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব ও সার্বক্ষণিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও দিকনির্দেশনায় এবার ঢাকা বিমানবন্দরে হাজিদের জন্য বিনামূল্যে উন্নত লাগেজ র্যাপিং, ২৪ ঘণ্টা বিশুদ্ধ সুপেয় পানিসহ বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এছাড়া তীব্র গরমের কথা বিবেচনা করে আরাফা ও মিনার ময়দানে লাখো বাংলাদেশি হাজির মাঝে পুষ্টিকর জুস ও বিশেষ উপহার সামগ্রী বিতরণের এক চমৎকার ব্যবস্থাও সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়, যা হাজিদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী আগামী বছরের হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও বেশি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বমানের করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হাজিদের মাঠপর্যায়ের নানা ছোটখাটো ভোগান্তি ও অভিযোগ গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে কিছু হজ প্যাকেজের অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং অনিয়মে জড়িত কয়েকটি বেসরকারি এজেন্সির কার্যক্রম নতুন করে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে হজের ব্যয় কমিয়ে আনার বিষয়ে বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করছে। সৌদি আরবের উন্নত ও আধুনিক হজ ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করে ধর্মমন্ত্রী বলেন, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, নিরাপদ এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশে এবারের হজ সম্পন্ন হয়েছে, যার জন্য সৌদি সরকার ও মক্কা-মদিনার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রশংসার দাবিদার। বাংলাদেশ সরকার, সৌদি রাজকীয় সরকার, হজ-সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন হজ এজেন্সি এবং সততার সাথে দায়িত্ব পালনকারী গণমাধ্যমের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টাই এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে সফলতার বন্দরে পৌঁছে দিয়েছে, তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে মহান আল্লাহর অফুরন্ত রহমত।
হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা হাব-এর সম্মানিত মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদারও এবারের সামগ্রিক হজ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একই ধরণের ইতিবাচক ও সন্তোষজনক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে এবারের হজ ব্যবস্থাপনা ছিল বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, গতিশীল ও সফল। কোনো ধরনের বড় অপ্রীতিকর ঘটনা, অনিয়ম বা দালালের দৌরাত্ম্য ছাড়াই হজের সব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা আসলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের একটি যৌথ ও চমৎকার টিমওয়ার্কের ফসল। তিনি আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার, ধর্ম মন্ত্রণালয়, সৌদি আরবের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বিমান চালনা সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর দীর্ঘদিনের সমন্বিত উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার কারণেই আল্লাহর মেহমানরা কোনো ধরনের বড় বেগ পেতে হয়নি এবং তারা পূর্ণ মনোযোগের সাথে নির্বিঘ্নে তাদের পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। দেশে ফেরা হাজিদের চোখে-মুখে এখন শুধু আল্লাহর ঘর জিয়ারতের পরম তৃপ্তি এবং ঘরের মানুষের কাছে ফিরে আসার আনন্দাশ্রু।