মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু: রুদ্ধশ্বাসে নিভে গেল ছয়টি তাজা প্রাণ, নেপথ্যে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের ভেন্টিলেশন বিপর্যয়
মহানগর ডেস্ক:
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ফুটফুটে ছয়টি নবজাতকের আকস্মিক ও বেদনাদায়ক মৃত্যুতে দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষায় থাকার পরও কীভাবে একসঙ্গে এতগুলো শিশুর প্রাণ ঝরে গেল, তা নিয়ে যখন দেশজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল, ঠিক তখনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ ও শিউরে ওঠার মতো তথ্য। হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের ভেন্টিলেশন তথা বাতাস চলাচল ব্যবস্থার চরম ত্রুটির কারণেই এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি ঘটেছে বলে প্রায় নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। আজ শনিবার এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত মঙ্গলবার গভীর রাতে। হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি অপারেটিভ ওয়ার্ডে তখন ১১ জন প্রসূতি মা এবং ছয়টি সদ্যজাত শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওই সুরক্ষিত ওয়ার্ডটিতে মধ্যরাতের দিকে একজন মা প্রচণ্ড অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভব করার কথা জানান। তাঁর অনুরোধে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স সাময়িকভাবে এসি বন্ধ করে দেন। কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ করার পর যে সেখানে বাতাস চলাচলের বিকল্প কোনো সুব্যবস্থা ছিল না, তা চরম অবহেলায় খেয়ালই করা হয়নি। প্রায় এক ঘণ্টা যাবত বন্ধ থাকে পুরো ওয়ার্ডের এসি। আর এই এক ঘণ্টাই মূলত কাল হয়ে দাঁড়ায় কোমলমতি শিশুদের জন্য। চারপাশ থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও ভেন্টিলেশন ত্রুটিযুক্ত ওই কক্ষটিতে অল্প সময়ের মধ্যেই কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় এবং তীব্র অক্সিজেন সংকট তৈরি হয়।
ভোররাতের দিকে কক্ষের তাপমাত্রা ও গুমোট ভাব কমাতে আবারও এসি চালু করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। এসি চালুর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটি নবজাতক তীব্র শ্বাসকষ্ট ও অসুস্থতায় ছটফট করতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা দ্রুত তাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু এর পরপরই একে একে ওয়ার্ডে থাকা বাকি চারটি শিশুও একইভাবে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগেই নিভে যায় ছয়টি নিষ্পাপ শিশুর জীবনপ্রদীপ। ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে পুলিশ এবং চিকিৎসকদের একাংশ ধারণা করেছিলেন, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় বদ্ধ ওয়ার্ডের পরিবেশে অক্সিজেনের চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা শিশুদের অপরিণত ফুসফুস সহ্য করতে পারেনি।
এদিকে এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরপরই হাসপাতালের বাইরে এবং ভেতরে শুরু হয় স্বজনদের আহাজারি ও তীব্র বিক্ষোভ। সন্তানহারা মা-বাবা এবং ক্ষুব্ধ স্বজনদের স্পষ্ট অভিযোগ, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের চরম পেশাগত অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একটি আধুনিক হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে যেখানে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন ও বাতাস চলাচলের স্বয়ংক্রিয় ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকার কথা, সেখানে সাধারণ একটি এসি বন্ধের কারণে কীভাবে বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার মূল কারণ উদঘাটন করে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেয়। অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে হাসপাতালের ওই নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের ভেন্টিলেশন ডিজাইনে মারাত্মক ত্রুটি খুঁজে পাওয়া গেছে, যা কোনো জরুরি মুহূর্তে বাতাস নিষ্কাশনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিল। আজ শনিবার জমা পড়তে যাওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই গাফিলতির পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একটি অবহেলা আর কাঠামোগত ত্রুটি কীভাবে ছয়টি পরিবারের স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল, মগবাজারের এই ঘটনা যেন তারই এক নির্মম ও কালো দলিল হয়ে রইল।