ক্রেতার স্বস্তি, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস: উদ্বৃত্ত আলুর ভারে পিষ্ট গ্রামীণ অর্থনীতি, কমছে আবাদ

 প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬, ০১:৫৮ অপরাহ্ন   |   কৃষি

ক্রেতার স্বস্তি, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস: উদ্বৃত্ত আলুর ভারে পিষ্ট গ্রামীণ অর্থনীতি, কমছে আবাদ

বিশেষ প্রতিবেদক: সকালের নাশতার টেবিলে ধোঁয়া ওঠা যে আলুভাজি পরম তৃপ্তিতে সাধারণ মানুষ খাচ্ছেন, তার পেছনে লুকিয়ে আছে দেশের লাখো কৃষকের নীরব কান্না। বাজারে আলু কিনতে গিয়ে ভোক্তারা যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, মাঠপর্যায়ে তা রূপ নিয়েছে হাহাকারে। চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষককে প্রতি কেজিতে গড়ে ৫ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে এবার এক কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ২৫ টাকা। অথচ বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১২ টাকায়। খরচ ও বিক্রয়মূল্যের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে দিন দিন আলু চাষ গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক আত্মঘাতী জুয়ায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, দেশে আলুর বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ১ কোটি টন। কিন্তু অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত বীজের ব্যবহারে উৎপাদন ছাড়িয়ে গেছে ১ কোটি ১৫ লাখ টনের ঘর। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ৩০ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় মাঠপর্যায়ে দামের এই চরম বিপর্যয় ঘটেছে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী থেকে শুরু করে মধ্যাঞ্চলের মুন্সীগঞ্জ কিংবা কুমিল্লার আলুচাষিদের ঘরে ঘরে এখন কেবলই দেনার দায়। রংপুরের গঙ্গাচড়ার কুড়িয়ার মোড় এলাকার প্রান্তিক কৃষক মিজানুর রহমান জানান, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবার তিনি আলু আবাদ করেছিলেন। কিন্তু ন্যায্যমূল্যের অভাবে ঘরে স্তূপ করে রাখা আলু এখন পচে নষ্ট হচ্ছে। টানা বর্ষণ আর বৈরী আবহাওয়ায় ঘরের আলু ঘরেই গলে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে বস্তা বস্তা আলু তিনি সড়কের পাশে ফেলে দিচ্ছেন। একই করুণ দশা মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার কৃষক হানিফ মিয়ার। গত মৌসুমে দুই একর জমিতে প্রায় ২১ হাজার ২৩০ কেজি আলু ফলিয়েছিলেন তিনি। হিমাগার ভাড়াসহ তার মোট বিনিয়োগ ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। অথচ দরপতনের বাজারে সব আলু বিক্রি করে তার পকেটে এসেছে মাত্র ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি আলু তিনি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন মাত্র ১ টাকা ২৭ পয়সায়। এই বিশাল লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে এবার আর তিনি মাঠে নামার সাহস পাননি। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে অনেক কৃষক এখন শেষ সম্বল জমি বিক্রি করছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন রিকশা চালাতে বা দিনমজুরি করতে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধানের পরেই আলুর অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের সিংহভাগ জেলার গ্রামীণ অর্থনৈতিক চাকা ঘোরে এই আলুকে কেন্দ্র করে। ফলে আলুর এই দরপতন কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থবিরতা ডেকে এনেছে। রাজশাহীর কৃষক নুরউদ্দিনের ভাষায়, আলু চাষ এখন আর কৃষি নেই, তা লটারি বা জুয়া খেলার মতো হয়ে গেছে। লাভ হবে নাকি পুরো পুঁজি ডুবে যাবে, তা আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় থাকে না। অথচ চাষের শুরুতে চড়া সুদে দাদন খাটাতে হয় কিংবা ব্যাংক থেকে ধার করতে হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এভাবে বছরের পর বছর লোকসান দিলে কৃষকরা উৎপাদন থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেবেন। ফলে সাময়িকভাবে ক্রেতারা সস্তায় আলু পেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষকের এই দুর্গতির পেছনে কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার সংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়ার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০০টি হিমাগার চালু থাকলেও সেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা মোট উৎপাদনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ভরা মৌসুমে যখন বাজারে আলুর ঢল নামে, তখন ধারণক্ষমতার অভাবে অনেক কৃষক আলু সংরক্ষণের সুযোগ পান না। এর ওপর হিমাগারের ভাড়াও দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে ৩৫০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও লোড-আনলোডের শ্রমিক খরচ যোগ হয়ে কৃষকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় আবার তীব্র লোডশেডিং এবং হিমাগার কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে ভেতরেই আলু পচে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপরেই এসে বর্তায়।

কৃষকের এই সর্বনাশের মাঝেও একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের পোয়াবারো। তারা মাঠপর্যায়ে পানির দরে আলু কিনে নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি করছে। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক ফড়িয়া বা দালালের চক্র সক্রিয় থাকায় কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি শহুরে ভোক্তাদেরও অনেক সময় বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এই অসম বাজার ব্যবস্থা ভাঙতে সরকারের পক্ষ থেকে তদারকি ও বাজার সংযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সরকার মাঝে মধ্যে আলু রপ্তানির অনুমতি ও সুযোগ দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে তা পর্যাপ্ত হচ্ছে না। ফলে উদ্বৃত্ত আলুর পুরো চাপ এসে পড়ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে।

অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তির একমাত্র উপায় হলো আলু প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটানো। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে যদি দেশে চিপস, স্টার্চ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিংবা গ্লুকোজ তৈরির পর্যাপ্ত কারখানা গড়ে তোলা যায়, তবে আলুর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আলু রপ্তানি বাড়াতে হলে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। তবে বর্তমানের এই চরম উদাসীনতার মাশুল ইতিমধ্যেই দিতে শুরু করেছে দেশ। ক্রমাগত লোকসানের কারণে চলতি মৌসুমে কৃষকদের মাঝে আলু চাষের আগ্রহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে দেশে ৪ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল, যা চলতি মৌসুমে নেমে এসেছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টরে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ কমে গেছে। আবাদ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাতেও। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের এই ক্ষোভ ও আবাদ কমে যাওয়ার কারণে আগামী মৌসুমে বাজারে আলুর তীব্র ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে। এক বছর অতিরিক্ত উৎপাদন এবং পরের বছর তীব্র ঘাটতির এই যে দুষ্টচক্র, তা থেকে বের হতে না পারলে দেশের আলু খাত অচিরেই এক গভীর অন্ধকূপে তলিয়ে যাবে। আর তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকল্পনা, আধুনিক ও সাশ্রয়ী সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৃষক পর্যায়ে সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement