সংবাদ শিরোনাম

গোজেক প্রতিষ্ঠাতার কারাদণ্ডে বিনিয়োগ আস্থায় শঙ্কা বাড়ছে

 প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

গোজেক প্রতিষ্ঠাতার কারাদণ্ডে বিনিয়োগ আস্থায় শঙ্কা বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইন্দোনেশিয়ার প্রযুক্তি খাতের অন্যতম পরিচিত উদ্যোক্তা এবং গোজেকের সহপ্রতিষ্ঠাতা নাদিয়েম মাকারিমকে দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় দেশটির বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বহুল আলোচিত এ রায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অন্য একটি পক্ষ বলছে, দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত হিসেবে এ রায় আইনের শাসনের বার্তাই বহন করছে।

গত ৩০ জুন জাকার্তার দুর্নীতি দমন আদালত নাদিয়েম মাকারিমকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মামলায় অভিযোগ ছিল, করোনা মহামারির সময় স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য এক মিলিয়নের বেশি ক্রোমবুক কেনার প্রকল্পে তিনি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুগলকে অযৌক্তিক সুবিধা দিয়েছেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, মাকারিমের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের প্রায় ১২ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। কারণ, যেসব এলাকায় ইন্টারনেট অবকাঠামো দুর্বল, সেখানে ক্রোমবুক কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না—এ বিষয়টি তাঁর জানা থাকার কথা ছিল।

তবে মামলাটি শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ, মাকারিমের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ দুর্বল এবং তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তাদের দাবি, প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসনের সময় কয়েকটি আলোচিত মামলার মতো এটিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।

জাকার্তাভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক নিকি ফাহরিজাল বলেন, এই রায়ের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ায় নতুন করে বিনিয়োগের আগে আরও সতর্ক হবেন। তাঁর ভাষ্য, অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও আইনি নিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশন অভিযোগ করে, গোজেকের তৎকালীন মূল প্রতিষ্ঠান এপ্লিকাসি কার্যা আনাক বাংসায় (একেএবি) গুগলের বিনিয়োগ থাকার কারণে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে গুগল সুবিধা পায়। পরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক স্কুলে ইন্টারনেটনির্ভর ক্রোমবুক কার্যকর না হওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক সুনোতো বলেন, দেশের অসম ইন্টারনেট অবকাঠামোর বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে এমন ডিভাইস নির্বাচন প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

রায়ের পর প্রসিকিউটর কর্নেলেস গিব পাওলুস এটিকে সেই সব শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচার হিসেবে উল্লেখ করেন, যারা সমান ডিজিটাল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অন্যদিকে গুগল শুরু থেকেই কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি এ মামলায় অভিযুক্তও হয়নি।

সিএসআইএসের গবেষক ফাহরিজালের মতে, গুগলের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রয়োজনীয় আইনি সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে তদন্তকারীরা সক্ষম হননি। পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর ভাষায়, ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচিতে গুগলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য সহজ ছিল না।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষক ট্রিসিয়া উইজায়া বলেন, নাদিয়েম মাকারিম শুধু একজন সাবেক মন্ত্রী নন, তিনি ইন্দোনেশিয়ার স্টার্টআপ খাতের উত্থানের প্রতীক। তাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের রায় ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

তিনি বলেন, গোজেকের দ্রুত উত্থানের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ার প্রযুক্তি ও ফিনটেক খাতে বড় আকারে বিনিয়োগ শুরু করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আস্থায় ধাক্কা লাগতে পারে।

২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। তাঁর উচ্চ ব্যয়ভিত্তিক বিভিন্ন জনকল্যাণ কর্মসূচি, বিশেষ করে বিনা মূল্যের মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্প, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের জুনে ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রুপিয়াহ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে বাজারের অনিশ্চয়তাও এর একটি কারণ।

তবে প্রাবোও সুবিয়ান্তো নিজেকে ব্যবসাবিরোধী নেতা হিসেবে দেখার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই। বরং টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের গবেষক সিওয়াগে ধর্মা নেগারা বলেন, মাকারিমের রায়ের আগেই ইন্দোনেশিয়ার নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, এই মামলা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে যোগ্যাকার্তার ইউনিভার্সিতাস ইসলাম ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির শিক্ষক তেগুহ ইউদো উইচাকসোনো মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের প্রভাব না পড়লেও বিদেশে থাকা দক্ষ ইন্দোনেশীয়দের দেশে ফিরে আসার আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মেধাপাচারের ঝুঁকি বাড়বে।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে পড়াশোনা শেষে ২০০৬ সালে দেশে ফেরেন নাদিয়েম মাকারিম। চার বছর পর তিনি গোজেক প্রতিষ্ঠা করেন। মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরে খাবার সরবরাহ, ডিজিটাল পেমেন্টসহ বিভিন্ন সেবা নিয়ে সুপার অ্যাপে পরিণত হয়। ২০১৯ সালে গোজেক ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়ন অর্জন করে ইন্দোনেশিয়ার প্রথম 'ডেকাকর্ন' প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

তবে সবাই এই রায়কে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না। বালিভিত্তিক মালেকাত হুকুম ইন্টারন্যাশনাল ল ফার্মের ব্যবসায় আইন বিশেষজ্ঞ আই গুস্তি নুগরাহ বায়ু প্রাদানা বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগ হওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তাঁর মতে, বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আইন প্রয়োগ নয়; বরং অনিশ্চিত ও বৈষম্যমূলক বিচারব্যবস্থা।

প্রসঙ্গত, মাকারিমের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। এ অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পান। একই সঙ্গে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের একজন বিচারক ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, মামলায় অসৎ উদ্দেশ্য বা স্বার্থের সংঘাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রাদানার মতে, বিচারকদের ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগই ইন্দোনেশিয়ার বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রমাণ। তিনি বলেন, আইন মেনে স্বচ্ছভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা হলে ইন্দোনেশিয়া এখনো বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement