আবেগে মোড়ানো আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল
ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্ব কাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বুধবার দিবাগত রাতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এই ম্যাচটি নানা কারণেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। প্রথম সেমিফাইনালে মোকাবেলা করা ফ্রান্স-স্পেনের ম্যাচ থেকেও কয়েকগুন বেশি ছিল টিকিটের মুল্য। পাশাপাশি নিরাপত্তাও বেশি রাখা হয়েছে এই ম্যাচকে ঘিরে। এই ম্যাচ ঘিরে শুধু মাঠেই নয়, গ্যালারিতেও উত্তেজনার পারদ চড়তে পারে বলে মনে করছে স্থানীয় প্রশাসন। সে কারণেই কঠোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আটলান্টা পুলিশ। দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্ধিতার ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ম্যাচটিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলকে ঘিরে দুই দেশের সমর্থকদের আবেগ এখনও তীব্র। এই দুই দলের ম্যাচ মানেই ১৯৬৬ বিশ্বকাপের রাতিন বিতর্ক, ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ডের বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। ফুটবল কখনো কখনো শুধু ৯০ মিনিটের খেলা থাকে না। ম্যাচের বাঁশি বাজতেই জেগে ওঠে ইতিহাস, রাজনীতি, অহংকার, প্রতিশোধ ও জাতীয় আবেগের বহু পুরনো ক্ষত।
আলোচিত ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালের বেলায় রেফারির বাঁশির অপেক্ষায় কেউ বসে নেই। তার আগেই সব অনুষঙ্গ এসে জড়ো হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর আর্জেন্টাইনদের মুখে শোনা গেছে সেই বিখ্যাত গান, ‘মালভিনাসের (ফকল্যান্ড) জন্য, যা এখন যুক্তরাজ্য নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ড।’ ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। অনেক হতাহতের পর এ দ্বীপপুঞ্জ ইংল্যান্ডের অধীনে থাকলেও আর্জেন্টিনা এখনো দাবি ছাড়েনি। তারা এ ভূখন্ডকে ডাকে ‘মালভিনাস’ নামে। বিশ্বকাপের পডকাস্টে এই স্প্যানিশ শব্দটি উচ্চারণ করায় ইংলিশ তারকা গ্যারি লিনেকার পড়েছেন ইংরেজদের ক্ষোভের মুখে। বোঝাই যাচ্ছে সেমিফাইনালের বেশ আগে থেকেই চারদিকে আগুনে উত্তাপ। সাবেক ইংলিশ তারকা ইয়ান রাইট অকপটে বলেছেন, তারা আর্জেন্টিনাকে ভয় পান না। তার বিশ্বাস, মার্ক গুহেহি ও জন স্টোনস মিলে বোতলবন্দি করে রাখবে লিওনেল মেসিকে। এই কথাগুলো বুয়েনস এইরেসে রীতিমতো বজ্রপাত ঘটিয়েছে।
এদিকে আর্জেন্টিনার পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘ইংল্যান্ড আমাদের খাটো করে দেখছে।’ ১৯৬৬ সালে একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর ইংল্যান্ড ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যর্থতার পাকচক্রে। সেই শিরোপার জয়ের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্থেনিও রাতিনকে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। সেখান থেকেই ফুটবলে লাল-হলুদ কার্ডের সূত্রপাত। সেবার ইংলিশ কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ ডেকেছিলেন। ২০ বছর পর এর জবাব দিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা মেক্সিকোতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ ও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সুন্দরতম গোলটি করে। এরপর তারা ১৯৯৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ডের পর টাইব্রেকারে বিদায় করেছিল ইংল্যান্ডকে। এসব অনুষঙ্গে আটলান্টার ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বেশ ঝাঁজালো পরিবেশ। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য উত্তাপে জল ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বলেছেন, ‘এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ।’ তিনি যতই খেলার বাহানা দিয়ে দু’পক্ষের উত্তেজনা প্রশমিত করতে চান, ততই সমর্থকরা ফুঁসে ওঠেন। দুই দলের সমর্থকদের থামাতে হিমশিম খাচ্ছে আটলান্টা পুলিশও।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ হলেই পরিস্থিতি এমন হবে। আসলে ইতিহাস বারবার একই নাটকের নতুন মঞ্চ খুঁজে নেয়। এবারের গল্পের উজ্জ্বল চরিত্র লিওনেল মেসি। তিনি প্রথম মুখোমুখি হবেন ইংল্যান্ডের। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি সময়ের নিয়ম মানতে রাজি নন। প্রজন্ম বদলেছে কিন্তু বড় মঞ্চে আলোটা এখনো তার দিকেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে আছে। ছয় ম্যাচে ৮ গোল করা জাদুকর স্মরণীয় করে রাখতে চাইবেন এ ম্যাচটিকে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল বিশ্বাস করেন, ইতিহাস বদলানোর সময়ে এসেছে। কেইন-বেলিংহামে দুরন্ত হয়ে ছুটছে ইংল্যান্ড। এটা আসলে সামর্থ্য প্রমাণের ম্যাচ নয়। দু’পক্ষের শক্তির তুল্যমূল্য বিচার দিয়েও হয়তো কিছু আসে যায় না। কারণ, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড যখন মুখোমুখি হয় তখন ফুটবলের সঙ্গে চলে আসে নানান ইতিহাসও। আসবে ফকল্যান্ড যুদ্ধ। আসবে ১৯৬৬। ম্যারাডোনার হাত এবং বৈরিতার অসংখ্য স্মৃতি। এই সেমিফাইনালে পুরো পৃথিবী দেখবে ফুটবল কীভাবে দুই জাতির আবেগের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সমর্থকদের দেখলে মনে হতে পারে, ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার দা-কুমড়ো সম্পর্ক। অথচ বাস্তবে সেটা একদমই নয়। লাতিন আমেরিকার দেশ হিসেবে দুটো দলই একটা সময় ইউরোপিয়ানদের আধিপত্যের বিরোধিতা করেছে। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ব্রাজিলের দেখাই হয়েছে চারবার, তাতে ব্রাজিলের জয় দুবার আর সবশেষ দেখা ১৯৯০ সালে সেটাও ৩৬ বছর আগে। এই দ্বৈরথগুলোর কোনোটিই ছিল না শিরোপা নির্ধারণী বা আসরের সেমিফাইনালের মতো পর্বে। বরং আর্জেন্টিনার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ফুটবল নিয়ে বৈরিতা উরুগুয়ের, সেই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে। কিছুটা বলা যেতে পারে ইতালির সঙ্গেও।