সংবাদ শিরোনাম

ট্রাম্পঘনিষ্ঠ গ্রাহামের উত্তরাধিকার: যুদ্ধ, ইসরায়েল, বিতর্কিত অবস্থান

 প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পঘনিষ্ঠ গ্রাহামের উত্তরাধিকার: যুদ্ধ, ইসরায়েল, বিতর্কিত অবস্থান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে দেশটির রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন, সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিলেন। শনিবার স্বল্পকালীন আকস্মিক অসুস্থতায় ৭১ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয় বলে সিনেটরের কার্যালয় জানিয়েছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গ্রাহাম ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের জোরালো সমর্থক ছিলেন। পরবর্তী সময়েও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তার অবস্থান ছিল কঠোর। জীবনের শেষ কয়েক মাসে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে চাপ প্রয়োগ করেন।

ইসরায়েলের পক্ষে অনড় অবস্থান

২০২৪ সালে হারিকেন হেলেন দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালালেও এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎই ইসরায়েলের প্রসঙ্গ তোলেন গ্রাহাম। তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রতি যথেষ্ট সমর্থন দেখাননি। তার ভাষায়, ইসরায়েলকে আরও বেশি সামরিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ছিল গ্রাহামের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ২০২১ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর তিনি দেশটিতে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে "More for Israel" লেখা একটি ব্যানারের সামনে ছবি তোলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস থেকে ইসরায়েলের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন।

গ্রাহামের মৃত্যুর পর নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রায়ই এমন পরিমাণ মার্কিন সহায়তা চাইতেন, যা ইসরায়েল সরকার নিজেও দাবি করত না। এমনকি ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তা ধীরে ধীরে বন্ধ করার প্রস্তাবেও তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন।

ইসরায়েলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও রয়েছেন, গ্রাহামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

ফিলিস্তিন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য

ফিলিস্তিন ইস্যুতে গ্রাহামের বক্তব্য বহুবার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি ফিলিস্তিনিদের নাৎসিদের সঙ্গে তুলনা করেন এবং বলেন, ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন মনে করলে যে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।

২০২৪ সালে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার উদাহরণ টেনে বলেন, ইসরায়েলেরও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর তিনি বলেন, "ইসরায়েল নিজেদের রক্ষায় যা প্রয়োজন তাই করুক।"

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফিলিস্তিনি কমিউনিটি নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান হাতেম আবুদাইয়েহ গ্রাহামকে "যুদ্ধপন্থী রাজনীতিক" আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি সারা জীবন যুদ্ধ ও দখলদার নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক ছিলেন গ্রাহাম। ২০১৬ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের সময় তিনি ট্রাম্পকে "বর্ণবিদ্বেষ উসকে দেওয়া ব্যক্তি", "উগ্রপন্থী" এবং "দায়িত্ব পালনে অযোগ্য" বলে মন্তব্য করেছিলেন।

তবে ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দুজনের সম্পর্ক আমূল বদলে যায়। গ্রাহাম প্রেসিডেন্টের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগীতে পরিণত হন। নিয়মিত বৈঠক, গলফ খেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে দুজনের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্রাহাম ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে "Make Iran Great Again" লেখা একটি টুপি তাকে পরিয়ে দেন, যা ইরানে শাসন পরিবর্তনের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। কয়েক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করলে গ্রাহাম প্রকাশ্যে তার সমর্থনে বক্তব্য দেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র কর্মসূচির পরিচালক মাইকেল হান্নার মতে, ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গ্রাহাম প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাম্পই নিয়েছিলেন।

যুদ্ধপন্থী রাজনীতির প্রতীক

আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন কমতে শুরু করলেও গ্রাহাম কখনো তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি। চলতি বছর লেবাননে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অংশগ্রহণের পক্ষেও তিনি প্রকাশ্যে মত দেন।

এ নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টিম বারচেট মন্তব্য করেছিলেন, "লিন্ডসে গ্রাহাম এমন কোনো মারামারি দেখেননি, যেটিকে তিনি বোমা হামলায় রূপ দিতে চাননি।"

রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসনও বলেন, ইতিহাস গ্রাহামকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবেই মনে রাখবে।

মৃত্যুর পরও রাজনৈতিক প্রভাব

গ্রাহামের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গভর্নর হেনরি ম্যাকমাস্টারকে তার বোন ডারলিন গ্রাহাম নরডোনকে সিনেটের শূন্য আসনে অন্তর্বর্তী নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পরে গভর্নর সেই সুপারিশ গ্রহণ করেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাহামের মৃত্যু রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিদ্যমান মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, তরুণ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশ বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের বিষয়ে আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি সংযত অবস্থানে রয়েছে।

মাইকেল হান্নার ভাষায়, গ্রাহাম ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির এমন একজন জ্যেষ্ঠ নেতা, যার সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও ইসরায়েল-সমর্থন নিয়ে অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তার অনুপস্থিতি ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অভ্যন্তরীণ বিতর্কে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement