মেধাবীদের বিশ্বমঞ্চে যুক্ত করবে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, থাকবে না রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: মির্জা ফখরুল

 প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬, ০২:০৩ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মেধাবীদের বিশ্বমঞ্চে যুক্ত করবে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, থাকবে না রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: মির্জা ফখরুল

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:

জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তন ও নতুন বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার দিগন্ত উন্মোচনে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল দেশের উত্তর জনপদের অবহেলিত জেলা ঠাকুরগাঁও। জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ঠাকুরগাঁও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। গত ২৯ মে শুক্রবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়টির অস্থায়ী ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত এবং বিশ্বমানের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মানেই হলো বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সংকীর্ণতার কোনো স্থান নেই। আমাদের সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থাতে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে এবং বিশ্বের চলমান অগ্রযাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের কথা তুলে ধরে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের বয়স হয়েছে, হয়তো বেশিদিন এই পৃথিবীর আলোতে থাকব না। তবে আমাদের স্বপ্ন ও গভীর আকাঙ্ক্ষা—এই প্রতিষ্ঠানটি একদিন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে। এটি হবে সমগ্র ঠাকুরগাঁওবাসীর অহংকার ও গর্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির চেনা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র স্বজনপ্রীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। এখানে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হবে মেধা ও যোগ্যতা। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিংয়ে স্থান করে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করেন যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না, বরং শিক্ষাবিদদের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে সঠিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আধুনিক যুগে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তরুণদের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি নবনিযুক্ত উপাচার্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাজারমুখী ও কর্মসংস্থান উপযোগী আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করতে হবে। প্রথাগত ডিগ্রির পেছনে না ছুটে এমন সব বিষয় বা বিভাগ চালু করার নির্দেশ দেন, যা পড়ে শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব না বাড়ে, বরং তারা দেশ ও বিদেশের কর্মসংস্থানে সরাসরি অবদান রাখতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইটি, আধুনিক কৃষিবিদ্যা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।

উত্তরাঞ্চলের খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষিজমি রক্ষার বিষয়েও দূরদর্শী ভাবনার পরিচয় দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যত্রতত্র কৃষিজমি নষ্ট করা হবে না। পরিবেশের ভারসাম্য ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে যতটুকু জমির প্রয়োজন, শুধু ততটুকুই ব্যবহার করা হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো আনুভূমিকভাবে না বাড়িয়ে উপরের দিকে অর্থাৎ বহুতল বিশিষ্ট হিসেবে সম্প্রসারণ করা হবে, যা আধুনিক নগর পরিকল্পনার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই স্বপ্নের প্রকল্পকে বাস্তব রূপ দিতে তিনি দলমত নির্বিশেষে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলাম। তারা দুজনেই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক ইসরাফিল শাহীন তাঁর স্বাগত বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যাদের চোখে-মুখে ছিল এক নতুন সম্ভাবনার আনন্দ।

উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের একাডেমিক ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটতে যাচ্ছে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের উচ্চশিক্ষার আবাসন সংকটের, আর শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে ঠাকুরগাঁওয়ের এক নতুন পথচলা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement