বৃষ্টি ও ঈদের ছুটিতে স্বস্তির নিশ্বাস ঢাকায়, দূষণের শীর্ষে রিয়াদ
অনলাইন ডেস্ক:
টানা বৃষ্টি আর পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির যৌথ প্রভাবে রাজধানী ঢাকার চেনা রূপ যেন অনেকটাই বদলে গেছে। চিরচেনা যানজট, কালো ধোঁয়া আর ধুলোবালির নগরী ঢাকা এখন অনেকটাই শান্ত এবং এর বাতাস আগের তুলনায় বেশ সহনীয়। ঈদের ছুটিতে লাখো মানুষের ঢাকা ছাড়ার কারণে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও সরকারি নির্মাণকাজ আংশিকভাবে বন্ধ থাকায় বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে আসা সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত যেন পুরো শহরের জমে থাকা ময়লা আর বিষাক্ত বাতাসকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়েছে। যদিও গত দুই দিন ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় রোদের তীব্রতার সাথে সাথে দূষণের মাত্রা কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে ঢাকার সামগ্রিক বায়ুমান এখনো মাঝারি বা সহনীয় পর্যায়েই অবস্থান করছে।
শনিবার (৩০ মে) সকালের আন্তর্জাতিক পরিবেশগত পরিসংখ্যানও ঢাকার এই ইতিবাচক পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের (IQAir) সকাল ৭টা ৪৩ মিনিটের লাইভ ডাটা অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) বা বায়ুমান সূচক রেকর্ড করা হয়েছে ৮২। বিশ্বের ১২৭টি প্রধান ও দূষিত শহরের তালিকায় এই স্কোর নিয়ে ঢাকা আজ ১৯তম অবস্থানে নেমে এসেছে, যা শীতকালের নিয়মিত শীর্ষ তিন বা পাঁচের অবস্থানের তুলনায় অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোরকে ‘ভালো’ এবং ৫১ থেকে ১০০ স্কোরকে ‘মাঝারি’ বা সহনীয় বায়ুমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে ঢাকার বাতাস এখন নগরবাসীর জন্য অনেকটাই নিরাপদ ও শ্বাসযোগ্য।
তবে ঢাকার এই স্বস্তির চিত্রের বিপরীতে বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়। আজকের হালনাগাদ তালিকায় ২১৭ স্কোর নিয়ে বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। মরুঝড় এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে রিয়াদের বাতাস আজ ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। তালিকায় ১৮৯ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের রাজধানী কিনশাসা। চিলির সান্তিয়াগো শহর ১৫০ স্কোর নিয়ে তৃতীয় এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ১৪৫ স্কোর নিয়ে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা ১৪২ স্কোর নিয়ে দূষণের শীর্ষ তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে, যা স্পষ্ট করে যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে এখনো দূষণের তীব্রতা বজায় রয়েছে।
আইকিউএয়ারের বৈশ্বিক সূচকের নিয়ম অনুযায়ী, বায়ুর মান ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে থাকলে তা ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে ধরা হয়, যেখানে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় বাইরে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া স্কোর ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে থাকলে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে হলে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে তা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা বছরের বেশিরভাগ সময়, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে, এই বিপজ্জনক ও অস্বাস্থ্যকর স্তরেই ঘুরপাক খায়।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, ঋতু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে বর্ষা মৌসুমে বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫ ও ধুলোবালি বৃষ্টির পানির সাথে মাটিতে মিশে যায়। ফলে ঢাকার বায়ুমানে এই স্বাভাবিক ও সাময়িক উন্নতি দেখা যায়। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় শীতকালে, যখন তাপমাত্রা কমে যায় এবং বাতাসের গতিবেগ স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে দূষিত কণাগুলো বাতাসের নিচের স্তরেই আটকে থাকে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ঈদের ছুটি শেষ হতে চলায় কর্মজীবী মানুষ আবারও শহরে ফিরতে শুরু করেছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নগরীর স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য, কলকারখানা এবং নির্মাণকাজ পুরোপুরি শুরু হলে এবং নতুন করে বৃষ্টি না হলে ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা আবারও আগের মতো উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই এই সাময়িক স্বস্তিকে স্থায়ী করতে হলে সমন্বিত পরিবেশ নীতি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।