রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে জিরো টলারেন্স: প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর দুই সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অ্যাকশন

 প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬, ০২:০২ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে জিরো টলারেন্স: প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর দুই সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অ্যাকশন

অনলাইন ডেস্ক:

পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে চরম গাফিলতির অভিযোগে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক অ্যাকশনের মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মাঠপর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের চরম ব্যর্থতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কারে উদাসীনতা এবং বর্ষার শুরুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারায় দুই সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ শীর্ষ স্তরের আরও ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জনদুর্ভোগ সৃষ্টির দায়ে অভিযুক্ত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে স্পষ্ট আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এর আগে শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান, যা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

শুক্রবার রাতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশনার কথা নিশ্চিত করে জানান, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের এমন উদাসীনতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কার্যকর করতে ইতিমধ্যেই দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে আগামী ১ জুন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ২০টি বিশেষ তদন্ত দল একযোগে মাঠে নামবে। এই বিশেষ দলগুলো পুরো ঢাকা শহরের বর্জ্য অপসারণের বাস্তব চিত্র এবং কর্মকর্তাদের অবহেলার গভীরতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এই নাটকীয় ও আকস্মিক ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার দুপুরে, যখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাজধানীর সার্বিক পরিস্থিতি ও নাগরিক ভোগান্তি মূল্যায়নে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিক পরিদর্শনে বের হন। গুলশানের বাসভবন থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পরিদর্শনে সরকারপ্রধানের গাড়ি বহর রামপুরা, মালিবাগ, বাসাবো, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইখাল, নারিন্দা, বংশাল, গুলিস্তান, শাহবাগ, নিউমার্কেট, জিগাতলা, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, বিজয় সরণি ও মহাখালীসহ মহানগরের প্রধান প্রধান সড়ক ও অলিগলি ঘুরে দেখে। এই সময় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ অ্যাডভোকেট মেহেদুল ইসলাম। দীর্ঘ পরিদর্শনের এক পর্যায়ে হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিনরোড, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকার রাস্তায় কোরবানির পশুর বর্জ্য ও ময়লার স্তূপ জমে থাকতে দেখে এবং বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রধানমন্ত্রী।

জনদুর্ভোগের এই চিত্রের জন্য সরাসরি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে তিনি তৎক্ষণাৎ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছাদেকুর রহমান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মোস্তানজিরকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরপরই এই দুই কর্মকর্তাকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ঘটনার পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন ধরে ঈদুল আজহার বর্জ্য দ্রুত অপসারণের যে দাবি দুই সিটির পক্ষ থেকে করা হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনে তার বাস্তব ও কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এই বিষয়ে জানান, শুধু কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই নয়, ঢাকার বিভিন্ন চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং বর্ষা মৌসুমের শুরুতে জলজট ও ডেঙ্গুর মশার বিস্তার রোধে সিটির প্রস্তুতি কেমন, তাও প্রধানমন্ত্রী নিজে পরখ করে দেখেছেন। সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দ যেন ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্বে মাটি না হয়, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। দুই সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক ও নজিরবিহীন অ্যাকশনের পর পুরো আমলাতন্ত্র ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ঝাঁকুনি লেগেছে। ঢাকার দুই সিটির এই প্রশাসনিক রদবদল, ওএসডি এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্তের সিদ্ধান্তকে রাজধানীর সামগ্রিক নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণে একটি বড় এবং স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল। নাগরিক অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে যে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না, এই অ্যাকশনের মাধ্যমে সরকারপ্রধান তা স্পষ্ট করে দিলেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement