বিএনপি কি রাতের সরকার? প্রশ্ন তুলে শফিকুর রহমানের তীব্র আক্রমণ

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ন   |   সিলেট

বিএনপি কি রাতের সরকার? প্রশ্ন তুলে শফিকুর রহমানের তীব্র আক্রমণ

প্রতিবেদক,সিলেট:

দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির তীব্র সমালোচনা করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে অতীতের বিতর্কিত ‘রাতের সরকার’-এর আচরণের সঙ্গে তুলনা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপি আসলে দিনের আলোকে ভয় পাচ্ছে কি না। মধ্যরাতে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রাতের অন্ধকারে আর্থিক খাতের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলের মতো ঘটনাগুলোকে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের লুকোচুরি হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।

সিলেট নগরের পূর্ব শাহি ঈদগাহ এলাকার জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগর শাখা আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সমাবেশে দেশের সামগ্রিক সংকট, নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতা অত্যন্ত কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত দিনের নানা ঘটনাপ্রবাহের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি সরকারের বিভিন্ন স্তরে সাবেক কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা জানান।

সমাবেশে শফিকুর রহমান বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি অভিযোগ করেন, এক সময়ের ব্যর্থ ও বিতর্কিত একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এছাড়া একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিও রাতের অন্ধকারে এবং এজেন্সির ভয়ভীতি দেখিয়ে করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। জামায়াত আমিরের মতে, মধ্যরাতে যখন মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তেলের দাম বাড়ানোর মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের লুকোছাপা করে দেশ চালানো এবং দিনের আলোকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা ‘হার্ট’ হিসেবে পরিচিত এই জায়গায় এমন একজনকে বসানো হয়েছে, যিনি মাত্র তিন মাস আগে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বিশ্বের ইতিহাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে এমন দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তি নিয়োগের কোনো নজির নেই বলে তিনি দাবি করেন।

সরকারের বিভিন্ন খাতে এখন যোগ্যতার চেয়ে পক্ষপাতিত্বকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় এই নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, জেলা পরিষদের প্রশাসক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন সব লোকজনকে বসানো হচ্ছে, যারা অতীতেও নানা অনিয়ম ও অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর ফলে দেশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটছে এবং সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

এদিকে নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে শফিকুর রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হলেও ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে চরম কারচুপি হয়েছে, যাকে তিনি ‘দুষ্টু রেজাল্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, জনগণ জামায়াতকে বিপুল সমর্থন দিলেও সেই জনরায়কে ছিনতাই করা হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের ৭০ ভাগ মানুষের কাঙ্ক্ষিত রায়কে অগ্রাহ্য করে এবং গণভোটের রায়কে সম্মান না জানিয়ে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে, তা মূলত দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাধারণ জনগণকে স্পষ্ট অপমান করার শামিল। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চললেও এটি এক সময় ‘ছাইচাপা আগুন’ থেকে আগ্নেয়গিরিতে রূপ নেবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।

সম্প্রতি জামায়াত নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ‘গুপ্ত’ বা অন্তরালে থাকার কটূক্তির কড়া জবাব দেন দলটির আমির। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তাঁরা দেশের ভেতরেই ছিলেন, কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। বছরের পর বছর জেল খাটার অভিজ্ঞতাকে তিনি দেশের ভেতরে থেকে লড়াই করার গৌরবময় অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। সুদিনে কিংবা দুর্দিনে সবসময় দেশের মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, রাজনীতি করতে হলে দেশের মাটিকে ধারণ করতে হবে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে নিরাপদ দূরত্বের বীরত্বকে তাঁরা ঘৃণা করেন।

জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে কেবল রেশনিং বা কার্ড ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বাজার সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি বন্ধের তাগিদ দেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এমনিতেই তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে। তখন সাধারণ মানুষের পকেট কাটার জন্য কোনো বিশেষ কার্ডের প্রয়োজন হবে না। আর যদি কার্ড দিতেই হয়, তবে তা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যেহেতু হচ্ছে, তাই সংসদে আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছ ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন শফিকুর রহমান। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে প্রটোকল অনুযায়ী গাড়ি, চালক, তেল ও রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা গ্রহণ করছেন না বলে জানান। তিনি লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানিয়েছেন যে, জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা না চাপিয়ে তিনি কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা নেবেন না। সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ওপর জোর দেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement