হাওর অঞ্চলে ভয়াবহ কৃষি বিপর্যয়: ধান-খড় নষ্ট, খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে
সিলেট প্রতিনিধি ।।
সিলেট-কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর মানবিক ও কৃষি সংকট। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে বোরো ধান ও খড় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় কৃষকদের জীবন-জীবিকাকেই বিপন্ন করছে না, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত কয়েক দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ হাওর প্লাবিত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা আগাম শুরু হওয়া এবং বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বৃদ্ধিও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে কাটা ধান শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে। খড়ের স্তূপ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা জানান, পানি জমে থাকার কারণে ধান কাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিক সংকট এবং রোদ না থাকায় ধান শুকানোর সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক পরিবার নিজেদের উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে পানির মধ্যে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছে, যা তাদের জীবনের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
এদিকে, স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও কৃষিঋণ সংক্রান্ত কিছু উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু না হলে কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সহায়তা নয়, প্রয়োজন সময়োপযোগী ও কার্যকর ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর অঞ্চল দেশের মোট বোরো উৎপাদনের একটি বড় অংশ জোগান দেয়। ফলে এই অঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানি হলে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব থেকে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, খাদ্য সংকট এবং জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।