সড়কবাতির প্রযুক্তি শিখতে ফ্রান্স যাচ্ছেন রাসিক প্রশাসক, খরচ দিচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
রাজশাহী প্রতিবেদক:
রাজশাহী মহানগরীকে আরও আধুনিক ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী আলোকসজ্জায় সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। তবে এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রযুক্তির খোঁজখবর নিতে এবার খোদ ফ্রান্সে উড়াল দিচ্ছেন রাসিকের শীর্ষ কর্তারা। সড়কবাতির আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা নিতে ১১ দিনের এক সরকারি সফরে ফ্রান্সে যাচ্ছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন। তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) এ বি এম আসাদুজ্জামান সুইট। বর্তমান সময়ে যেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানো নগর প্রশাসনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ, সেখানে এই সফরকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছে নগর কর্তৃপক্ষ।
রাসিক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ফ্রান্সে অবস্থান করবেন এই প্রতিনিধিদল। সফরের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ও সরকারি ছাড়পত্রের জন্য গত ১২ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে একটি দাপ্তরিক চিঠি পাঠান রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম। চিঠিতে সফরের উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকসজ্জা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর বিশেষ আমন্ত্রণে রাসিকের এই দুই কর্মকর্তা ফ্রান্স সফরে যাচ্ছেন। সেখানে অবস্থানকালে তাঁরা সিগনিফাইয়ের অত্যাধুনিক ‘আউটডোর লাইটিং অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার’ পরিদর্শন করবেন। একই সঙ্গে উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত সড়কবাতির সর্বাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি কীভাবে রাজশাহীতে প্রয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন।
তবে এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে এর অর্থায়ন। সফরসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাসিক কর্মকর্তাদের এই ফ্রান্স ভ্রমণের বিমান ভাড়া, উন্নত আবাসন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক প্রয়োজনীয় ব্যয়সহ পুরো খরচের দায়ভার বহন করবে আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড। সরকারি কোষাগার কিংবা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে এই সফরের জন্য কোনো অর্থ খরচ করা হচ্ছে না। এই অর্থায়নের বিষয়টি দেশের প্রশাসনিক মহলে যেমন স্বস্তি দিচ্ছে, তেমনি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে বিভিন্ন মহলে মৃদু গুঞ্জন ও কৌতূহলেরও সৃষ্টি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন তৈরি হলে সিগনিফাই বাংলাদেশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, তাদের মূল প্রতিষ্ঠানটি ফ্রান্সে উৎপাদিত বিশ্বমানের সড়কবাতি বাংলাদেশে সরবরাহ করে থাকে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাধারণত ডিলারদের মাধ্যমে এই উচ্চমানের আলোক সামগ্রী ক্রয় করে থাকে। নিয়মানুযায়ী, কোনো বৃহৎ সংস্থা যখন বড় কোনো প্রকল্পে তাঁদের উৎপাদিত সড়কবাতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় বা আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সরেজমিনে দেখানোর জন্য এ ধরনের শিক্ষামূলক সফরের সুযোগ দেওয়া হয়। এটি তাদের বৈশ্বিক বিপণন ও প্রযুক্তি বিনিময়ের একটি নিয়মিত অংশ।
অবশ্য এই সফরের নেপথ্যে রাজশাহীর কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প জড়িত কি না, তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থেকে গেছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন বর্তমানে কোন স্থানীয় ডিলারের মাধ্যমে সড়কবাতি সংগ্রহ করছে বা ভবিষ্যতে বড় কোনো চুক্তি হতে যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সিগনিফাই বাংলাদেশের ওই কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। অন্যদিকে, এই বিদেশ সফরের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং নগরীর উন্নয়নে এর বাস্তব প্রতিফলন কীভাবে ঘটবে, তা জানতে রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) এ বি এম আসাদুজ্জামান সুইটের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় এই সফর ও ভবিষ্যৎ প্রকল্প নিয়ে তাঁদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত এই প্রযুক্তি শিক্ষা সফর রাজশাহীর সড়কবাতি ব্যবস্থায় কতটা আধুনিকতার ছোঁয়া আনতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।