বর্জ্য অপসারণে অবহেলা: ওএসডির পর এবার সাময়িক বরখাস্ত দুই সিটির দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা
অনলাইন ডেস্ক:
রাজধানীর কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে চরম গাফিলতি ও অসদাচরণের দায়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই শক্তিশালী আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকারের উপসচিব পদমর্যাদার এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত এই কঠোর ব্যবস্থা নিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন—ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১-এর সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির। এর আগে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছিল।
সোমবার (১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং পরবর্তী বিভাগীয় প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করার স্বার্থেই তাদের সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা সমীচীন মনে করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে নিয়ম অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তারা বিধি মোতাবেক খোরপোশ ভাতা বা জীবনধারণের জন্য নির্দিষ্ট ভাতা প্রাপ্য হবেন।
এই নাটকীয় ও নজিরবিহীন সাজার নেপথ্যে রয়েছে স্বয়ং সরকারপ্রধানের এক ঝটিকা ও গোপন সফর। পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন গত শুক্রবার কাউকে কোনো পূর্বভাস না দিয়ে, সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে রাজধানীর কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম স্বশরীরে পরিদর্শনে বের হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই দিন দুপুর দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা প্রায় চার ঘণ্টা তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকা নিজে গাড়ি চালিয়ে ঘুরে দেখেন। রাষ্ট্রপ্রধানের এই অতর্কিত অভিযানে ধুলোবালি ও বর্জ্যের বাস্তব চিত্রটি সরাসরি উন্মোচিত হয়। সেই সময় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে তার সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মৃধা এবং প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মেহেদুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী তার পরিদর্শনের অংশ হিসেবে হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিন রোড, ফার্মগেট এবং কারওয়ান বাজার এলাকা ঘুরে দেখার সময় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঈদের পরদিনও এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকার প্রধান সড়ক ও সংযোগ সড়কগুলোতে কোরবানির পশুর বর্জ্যের পাশাপাশি আগের জমে থাকা পুরনো ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। বৃষ্টির পানি আর পশুর রক্ত-বর্জ্য মিশে একাকার হয়ে তৈরি হওয়া দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এই দুর্গতির চিত্রটি খোদ সরকারপ্রধানের নজরে আসার পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বর্জ্য অপসারণে মাঠ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও উদাসীনতার বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে এবং তিনি এতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সেই সরাসরি নির্দেশনার পর পরই প্রথমে দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ক্লোজড বা ন্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার এই বরখাস্তের চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হলো। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই ঘটনায় শুধু এই দুই কর্মকর্তাই নন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ওয়ার্ড ভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দায়িত্বরতদের অবহেলার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের এমন ব্যর্থতার পেছনে আর কার কার গাফিলতি রয়েছে, তা উদঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও কাজ করছে। প্রশাসনের এই কঠোর বার্তা মাঠ পর্যায়ের অন্যান্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে আরও সজাগ ও তৎপর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।