ভোক্তার স্বস্তিতে চোখ সরকারের: বৈশ্বিক চাপে জ্বালানির দাম সমন্বয়, ডিজেল অপরিবর্তিত

 প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৬:৩৫ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

ভোক্তার স্বস্তিতে চোখ সরকারের: বৈশ্বিক চাপে জ্বালানির দাম সমন্বয়, ডিজেল অপরিবর্তিত

স্টাফ রিপোর্টার: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে ধারাবাহিক অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলে দেশের ভোক্তাদের দ্রুত সেই সুবিধা দিয়ে স্বস্তি ফেরানো হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি সরকারের এই অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন।

সম্প্রতি দেশের বাজারে পরপর দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে জনমনে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, প্রতি মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে দাম সমন্বয়ের একটি নিয়মিত স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। তবে জনস্বার্থ বিবেচনা করে গত মে মাসে কোনো ধরনের মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একান্তই নিরুপায় বা অত্যন্ত প্রয়োজন না হলে জনগণের ওপর বাড়তি কোনো আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় না সরকার। কিন্তু বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাস্তবতার নিরিখে কিছু ক্ষেত্রে এই মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরিহার্য ছিল।

দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর জ্বালানির প্রভাবের কথা উল্লেখ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, বাংলাদেশে মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৬ শতাংশই হচ্ছে ডিজেল। পরিবহন ও কৃষি খাতসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে এই জ্বালানিটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় এর পেছনে সরকারকে প্রতি বছর সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। তাই সাধারণ মানুষের ওপর যেন নতুন কোনো আর্থিক বোঝা চেপে না বসে, সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এবার ডিজেলের দাম সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আরও বাড়বে কি না—এমন আশঙ্কার জবাবে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করছে যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট দ্রুত নিরসন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমামাত্রই সরকার সেই সুবিধা দেশের সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। এটি একটি নির্বাচিত সরকার এবং জনগণের প্রতি এই প্রশাসনের গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেই মানুষের কষ্ট লাঘবে যেকোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।

একই সময়ে বিদ্যুৎ খাতের গ্রাহকদের মধ্যে দাম বাড়ার যে গুঞ্জন রয়েছে, সে প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে প্রতিমন্ত্রী বিইআরসির স্বাধীন ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ বা পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনের সেই স্বাধীন ক্ষমতা ইতিমধ্যেই পুনর্বহাল করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব থাকলেও তা সরাসরি কার্যকর করার সুযোগ নেই, বরং যথাযথ গণশুনানির মাধ্যমে সব পক্ষের মতামত নিয়ে তবেই তা চূড়ান্ত করতে হয়। এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কোনো ধরনের চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকার সময়েও দেশে কেন জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো—এমন সমালোচনার জবাবে প্রতিমন্ত্রী বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অতীতে বৈশ্বিক বাজারে যখন হুট করে দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল, তখনও সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তার পুরো চাপ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়নি, বরং বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকির কারণে সরকারের ওপর এখন বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, রাষ্ট্রকে শুধু জ্বালানি খাত নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক খাতেও নিয়মিত বিপুল ব্যয় অব্যাহত রাখতে হয়। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভর্তুকির বিষয়টি এখন আবেগের পরিমাপদণ্ডে না দেখে কঠোর বাস্তবতার আলোকেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।

ভর্তুকির এই বিশাল চাপ সামলাতে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে সরকারের মহাপরিকল্পনার কথাও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকার এখন ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব উৎসের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যেমন নাটকীয়ভাবে কমবে, তেমনি সরকারের ভর্তুকির চাপও কমে আসবে, যার সুফল হিসেবে গ্রাহকদের অনেক কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

এর পাশাপাশি দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে অফশোর বা গভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। একই সাথে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের মতো বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শিল্প ও উৎপাদন খাতে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এলএনজি আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement