নক্ষত্রপতন: অবসান হলো এক জীবন্ত ইতিহাসের, বিদায় নিলেন তোফায়েল আহমেদ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ। আজ সোমবার বেলা সাড়ে তিনটায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতায় ভুগছিলেন বরেণ্য এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিনসহ পরিবারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউমোনিয়াজনিত তীব্র শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও চরম শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আজ বিকেলে তিনি চিরবিদায় নেন। মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা, আত্মীয়-স্বজনসহ দেশজুড়ে কোটি ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং বাংলাদেশের একটি মহাকাব্যিক রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি নিজের মেধা, অনলবর্ষী বক্তৃতা আর সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে দ্রুত নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে আসেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি)। এই সময়কালেই তিনি বাঙালি জাতির ইতিহাসের অন্যতম প্রধান মোড় পরিবর্তনকারী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। এই গণ-অভ্যুত্থানের সফলতার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ।
রাজনীতির মাঠে তাঁর পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতা ছিল বিস্ময়কর। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি মাঠে থেকে মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) অন্যতম প্রধান কমান্ডার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতেও তিনি হয়ে ওঠেন এক অপরিহার্য স্তম্ভ। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশের সংসদীয় ইতিহাসে মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। জাতীয় রাজনীতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে তাঁর বাগ্মিতা এবং সংকট মোচনের ক্ষমতা ছিল প্রশংসনীয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম শীর্ষ সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো, যা সহজে পূরণ হবার নয়। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রাজনৈতিক মহল, সুশীল সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জড়ো হন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ও গুণগ্রাহীরা। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং রাজপথ থেকে উঠে আসা এক অকুতোভয় জননেতা হিসেবে। তাঁর এই মহাপ্রয়াণ বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটাল, যা এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।