ইসলামী ব্যাংকে উত্তাপ: নতুন চেয়ারম্যানকে বাধা, রণক্ষেত্র মতিঝিল
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আজ এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় পুরো ব্যাংকপাড়া রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই থমথমে পরিস্থিতিতে ওই এলাকার ব্যবসায়ী, পথচারী এবং সাধারণ ব্যাংক গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে আকস্মিক এই রদবদলকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই ব্যাংকটির ভেতরে ও বাইরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ঈদের ছুটির ঠিক আগের শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ব্যাংকটির একাংশের কর্মকর্তা ও গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা। আজ সোমবার সকালে নতুন চেয়ারম্যানের প্রধান কার্যালয়ে যোগদানের কথা থাকায় সকাল থেকেই মতিঝিল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত এই ফোরামের সদস্যরা নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের প্রবেশ ঠেকাতে এবং সদ্য পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহালের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। তারা ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে ব্যাংকের সামনের সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করলে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তাদের বাধা দেন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সকাল ১০টার দিকে পুলিশ কোনো রকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ শুরু করে। এতে ফেস্টুন ও ব্যানার ফেলে আন্দোলনকারীরা দিকবিদিক ছুটতে শুরু করেন। পরিস্থিতি আরও বেগতিক হলে পুলিশ একের পর এক টিয়ারশেল, জলকামান থেকে রঙিন পানি এবং তীব্র শব্দসম্পন্ন সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। বিকট শব্দে সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও টিয়ারশেলের ঝাঁজালো ধোঁয়ায় পুরো মতিঝিল এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আতঙ্কে চারপাশের বিপণিবিতান ও অন্যান্য ব্যাংকের শাখাগুলোর ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করেছে এবং জলকামান ব্যবহার করে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুস সালাম গণমাধ্যমকে জানান, এই কর্মসূচির জন্য আয়োজকদের কোনো পূর্ব অনুমতি ছিল না। ঢাকার ব্যস্ততম এই বাণিজ্যিক এলাকায় অনুমতি ছাড়া সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ তৈরি করায় পুলিশ তাদের বারবার সরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যানার প্রদর্শন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জননিরাপত্তা স্বার্থে পুলিশ জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে সড়কটি অবমুক্ত করে।
দুপুরের পর মতিঝিল এলাকার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও এর আশপাশের সড়কগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। এই ঘটনার পর ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং গ্রাহকদের লেনদেনেও এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের শীর্ষ পদের এই দ্বন্দ্ব দ্রুত নিরসন করা না হলে তা সার্বিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।