ফের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দিশাহারা মানুষের পিঠে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, ঠিক তখনই ফের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সংসারে নতুন করে চরম আঘাত হেনেছে। এক মাসের ব্যবধানে আবারও তেলের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে জনগণের সঙ্গে ‘সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও চরম ধোঁকাবাজি’ বলে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে দলটির পক্ষ থেকে এই তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার নিজেই যেখানে আশ্বস্ত করেছিল যে চলতি মাসে অন্তত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না, সেখানে হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র গত মাসেই এক দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য ৮ থেকে ১২ শতাংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের মানুষকে একবারে দিশাহারা করে তুলেছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বাজেট অধিবেশন শুরুর ঠিক প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে জ্বালানি তেলের এই দাম বাড়ানোর পেছনে এক ধরনের জনস্বার্থবিরোধী কৌশল লুকিয়ে রয়েছে। জামায়াতের বিবৃতিতে এই বিষয়টির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এটি একটি চরম জনবিরোধী পদক্ষেপ। সাধারণত বাজেট পেশের আগে এমন সংবেদনশীল খাতের মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তোলে।
বাস্তব চিত্রও অত্যন্ত ভয়াবহ। গত মাসের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকেই চাল, ডাল, তেল ও পেঁয়াজসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মুদি দোকান—সবখানেই আগুন। অথচ এই কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি বিন্দুমাত্র, বরং ক্রমাগত বেকারত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের সিংহভাগ মানুষ যখন দুবেলা দুমুঠো সুষম অন্ন জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই দফায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি যেন তাদের পিঠে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে, যা চেইন রিঅ্যাকশনের মতো দেশের প্রতিটি উৎপাদন ও সরবরাহ খাতকে গ্রাস করে। পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে সবজি ও খাদ্যশস্য আসার খরচ একলাফে অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে বাজারে নতুন করে দ্রব্যমূল্যের আরেকটি বড় ঢেউ আছড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বিবৃতিতে দেশের বর্তমান সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে এই অর্থনৈতিক সংকটের একটি গভীর যোগসূত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে, তার পেছনে জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সরাসরি দায়ী। পেটের দায়ে ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের কারণে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, যা আজ দেশ এবং সামগ্রিক সমাজের অস্তিত্বকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বিবৃতির শেষ অংশে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সব সময় জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের পক্ষে এবং যেকোনো ধরনের জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ভূমিকা পালন করে এসেছে। জনগণের এই চরম দুর্দশায় ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং জনগণের পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে অবিলম্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।