পাকা আমের সুবাসে মুখর বানেশ্বর: হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের হাতছানি রাজশাহীতে
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:
ঈদের খুশির আমেজ কাটতে না কাটতেই উৎসবের নতুন রঙে সেজেছে বরেন্দ্রভূমি। পাকা আমের মদির সুবাসে এখন মাতোয়ারা পদ্মাপাড়ের বাতাস। জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের ছোট ছোট হাট থেকে শুরু করে বড় বড় মোকাম—সবখানেই এখন কেবলই ফলের রাজা আমের রাজত্ব। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ আমের বাজার পুঠিয়ার বানেশ্বর হাটে ফিরতে শুরু করেছে চিরচেনা কর্মব্যস্ততা ও প্রাণের স্পন্দন। জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সূচি মেনে গাছ থেকে আম নামানো শুরু হওয়ায় বাজারে এখন পরিপক্ব ও নিরাপদ আমের সমারোহ। সংশ্লিষ্টদের আশা, সব ঠিকঠাক থাকলে চলতি মৌসুমে কেবল রাজশাহী জেলাতেই প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার আমের বিশাল বাণিজ্য হতে যাচ্ছে।
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই বানেশ্বর বাজারমুখী সড়কগুলোতে দেখা মিলছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। আমবোঝাই ভ্যান, করিমন, ট্রলি আর ছোট ছোট যান্ত্রিক যানবাহনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি এসে থামছে বাজারের আড়তগুলোর সামনে। পুঠিয়া, বাঘা, চারঘাট, দুর্গাপুর ও বেলপুকুরসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তের বাগান থেকে সংগৃহীত তরতাজা আমে সায়াহ্ন থেকেই মুখরিত হয়ে উঠছে শতাধিক আড়ত। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল স্থানীয় ব্যবসায়ী বা ক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজশাহীর আমের বিশ্বস্ততা ও স্বাদের টানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও কুমিল্লাসহ দেশের দূর-দূরান্তের জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে ভিড় জমিয়েছেন এই হাটে। তাদের পাশাপাশি সাধারণ খুচরা ক্রেতারাও পরিবারের জন্য খাঁটি আম কিনতে ছুটির দিনে বা অবসরে ভিড় করছেন বাজারে।
আড়তদার ও বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে ঐতিহ্যবাহী গুটি ও গোপালভোগের পাশাপাশি সুস্বাদু হিমসাগর, লক্ষণভোগ ও রানীপছন্দের মতো জনপ্রিয় জাতগুলো পুরোদমে উঠতে শুরু করেছে। তবে আমের এই বিশাল সরবরাহের মধ্যেও এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে চাষিদের মনে। ফলন ভালো হলেও মৌসুমের শুরুতে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক বাগান মালিক। বাঘা উপজেলার আমচাষি আব্দুল মান্নান জানান, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের চেহারা ও ফলন দুটোই বেশ সন্তোষজনক হয়েছে। কিন্তু বাজারে একসাথে প্রচুর পরিমাণ আম চলে আসায় দাম কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে। একই সুর শোনা গেল চারঘাটের চাষি রাকিবুল ইসলামের কণ্ঠেও। তবে তিনি আশাবাদী যে, জুনের মাঝামাঝিতে মৌসুমের যখন মধ্যভাগ চলবে, তখন আমের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে দামও বেশ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হবে।
আমের এই বাজারদর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে জাতভেদে প্রতি মণ গুটি আম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, লক্ষণভোগ ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা এবং লকনা ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রিমিয়াম জাতের মধ্যে গোপালভোগ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং হিমসাগর ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বেচাকেনা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী, আগামী ১০ জুন থেকে বাজারে আসবে কাঙ্ক্ষিত ব্যানানা ম্যাংগো ও ল্যাংড়া। এর ঠিক পাঁচ দিন পর অর্থাৎ ১৫ জুন থেকে নামবে আম্রপালি ও ফজলি। এছাড়া দেরিতে পাকা জাতগুলোর মধ্যে ৫ জুলাই বারি আম-৪, ১০ জুলাই আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি আম সংগ্রহের অনুমতি রয়েছে। চাষি সাইফুল ইসলাম জানান, প্রশাসনের এই কঠোর নজরদারির কারণে বাজারে এবার অপরিপক্ব বা রাসায়নিকযুক্ত আমের প্রবেশ প্রায় শূন্যের কোঠায়, যার সুফল সরাসরি পাচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
বাজারের এই জমজমাট পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী জাব্বির ও নাসির হোসেনরা জানান, দূরবর্তী জেলাগুলোর ব্যবসায়ীরা ট্রাকে করে প্রতিদিন টন কে টন আম নিয়ে যাচ্ছেন। ল্যাংড়া ও আম্রপালি বাজারে এলে বেচাকেনার এই পরিধি ও গতি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারই নয়, সুমিষ্ট ও মানসম্মত হওয়ায় রাজশাহীর এই আম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজের স্থান পোক্ত করেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশ এবং আমেরিকায় রপ্তানি শুরু হয়েছে এই অঞ্চলের আম, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলার ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের জেলা উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, এবার বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ঝড়-ঝঞ্ঝা না হওয়ায় আমের গুণগত মান ও ফলন দুটোই চমৎকার হয়েছে। নিরাপদ উপায়ে আম বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে তারা মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। সব মিলিয়ে এই আমের মৌসুমকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে বিপুল অঙ্কের টাকার প্রবাহ তৈরি হয়েছে, তা সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।