টেলিগ্রামে ‘৪০০ বছরের জিনের বাদশা’, সোলার অ্যাপসের ফাঁদে ২১ লাখ টাকা লোপাট

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন   |   রাজশাহী

টেলিগ্রামে ‘৪০০ বছরের জিনের বাদশা’, সোলার অ্যাপসের ফাঁদে ২১ লাখ টাকা লোপাট

অনলাইন ডেস্ক:

কখনও তিনি আধুনিক প্রযুক্তির সোলার প্যানেল কোম্পানির প্রতিনিধি, আবার কখনও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ‘৪০০ বছর বয়সী জিনের বাদশা’। বেশভূষা আর পরিচয়ের এই রূপান্তর কোনো রূপকথার গল্প নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করার এক অভিনব প্রতারণার চাল। অনলাইন অ্যাপে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এবং পরবর্তীতে জিনের বাদশার ভয় দেখিয়ে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অবশেষে ধরা পড়েছেন মো. আব্দুল হামিদ (৩৩) নামের এক চতুর প্রতারক। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য ফাঁস করে।

এই প্রতারণা চক্রের শিকার ভুক্তভোগী মমতাজ বেগম নামের এক নারী গত ১ জুন সিরাজগঞ্জ সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ নড়েচড়ে বসে। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, প্রায় তিন মাস আগে আব্দুল হামিদ নিজেকে একটি সোলার প্যানেল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে মমতাজের কাছে আসেন। তিনি দাবি করেন, ‘ইকো ভোল্ট’ নামের একটি বিশেষ সোলার অ্যাপসে টাকা বিনিয়োগ করলে অতি অল্প সময়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ মুনাফা পাওয়া সম্ভব। হামিদের এমন গোছানো ও প্রলোভন দেখানোর কথায় আশ্বস্ত হয়ে মমতাজ বেগম নিজের পরিচিত ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন। তার মাধ্যমে প্রায় ১০০ জন সাধারণ মানুষ নিজেদের কষ্টার্জিত জমানো টাকা ওই অ্যাপে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন।

শুরুর দিকে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আব্দুল হামিদ মমতাজের দল থেকে প্রায় ১১ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। এর কিছুদিন পর অধিক লাভের আরও বড় টোপ ফেলে ‘সিইএফ’ নামের আরেকটি অ্যাপের কথা বলেন তিনি। সরল বিশ্বাসে গ্রাহকরা বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমের সাহায্যে আরও ৬ লাখ টাকা তার হাতে তুলে দেন। কিন্তু কিছুদিন পরই ঘটে বিপত্তি। হঠাৎ করেই ‘ইকো ভোল্ট’ অ্যাপটি নিষ্ক্রিয় বা সাদা হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা তাদের টাকা তুলতে না পেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়লে হামিদ আবারও নতুন করে চাল চালেন। আগের লস পুষিয়ে দেওয়ার এবং আরও বড় মুনাফার লোভ দেখিয়ে তিনি নতুন করে আরও ৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এভাবে ধাপে ধাপে মোট ২১ লাখ টাকা পকেটে পোরেন এই প্রতারক।

টাকা খোয়ানোর পর যখন গ্রাহকরা তাদের আসল টাকা ফেরত চেয়ে হামিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন, তখনই শুরু হয় তার প্রতারণার দ্বিতীয় অধ্যায়। ডিজিটাল অ্যাপের উদ্যোক্তা থেকে তিনি রাতারাতি বনে যান অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। টাকা ফেরত চাইলে তিনি টেলিগ্রাম অ্যাপে 'Hamkail Moakael' নামের একটি ভুয়া আইডি ব্যবহার করে গ্রাহকদের মেসেজ ও কল দিতে শুরু করেন। সেখানে তিনি নিজেকে ৪০০ বছরের পুরনো ‘জিনের বাদশা’ দাবি করে অলৌকিক গজব নাজিল করার ভয় দেখাতেন এবং টাকা ফেরত চাওয়ার পরিণাম ভয়াবহ হবে বলে প্রাণনাশের হুমকি দিতেন। আধুনিক অ্যাপের প্রতারণার ওপর জিনের বাদশার এই মনস্তাত্ত্বিক ভয়ভীতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্তব্ধ করে দেয়।

তবে এই আধুনিক ‘জিনের বাদশা’র শেষ রক্ষা হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু, বিপিএম (বার)-এর কড়া নির্দেশনায় মাঠে নামে পুলিশের একাধিক বিশেষ দল। সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিখুঁত গোেন্দা নজরদারি চালিয়ে সলঙ্গা থানার বনবাড়ীয়া গ্রাম থেকে আব্দুল হামিদকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একটি ওয়ালটন ট্যাবলেট, একটি আধুনিক স্মার্টফোন এবং বিভিন্ন ভুয়া অ্যাপের প্রচারপত্র ও ডিজিটাল নথি জব্দ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সিরাজগঞ্জ সদর সার্কেল) নাজরান রউফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল হামিদ তার এই দ্বিমুখী প্রতারণার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি মূলত বেকার যুবক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরল মানুষকে টার্গেট করে বিভিন্ন সময়ে নামে-বেনামে অ্যাপ তৈরি করতেন। কিছুদিন ব্যবসা জমিয়ে অ্যাপ বন্ধ করে দিয়ে আবার নতুন নামে হাজির হতেন। আর কেউ টাকা ফেরত চাইলে জিনের বাদশার মুখোশ পরে হুমকি দিতেন।

সংবাদ সম্মেলনে সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. হাফিজুর রহমান এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের পেছনে অন্য কোনো বড় গডফাদার বা আইটি বিশেষজ্ঞ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জোর তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে প্রেরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement