রামিসার একটি জুতো ও এক টুকরো বুকফাটা হাহাকার: রেকর্ড গতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ, এবার কাঠগড়ায় ঘাতক দম্পতি
মহানগর ডেস্ক:
মিরপুর-১১ নম্বরের সেই চেনা ফ্ল্যাটটিতে আট বছরের ছোট্ট শিশু রামিসা আক্তারের চঞ্চল পায়ের শব্দ আর কখনো শোনা যাবে না। যে ফুটফুটে মেয়েটি সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো, তার চপল পায়ের এক জোড়া জুতোর একটি মাত্র এখন পড়ে আছে ঘরের কোণে—যা আজ এই নির্মম ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় এবং নির্বাক সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৯ মে পাশের ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল রামিসার মস্তকবিহীন দেহ, আর তার ফুটফুটে কাটা মাথাটি পড়েছিল বাথরুমের মেঝেতে। এই রোমহর্ষক ও পাশবিক ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্বে প্রবেশ করেছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মাত্র দুই দিনে ‘রেকর্ড গতিতে’ শেষ হয়েছে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ। আদালত কক্ষে যখন একের পর এক রক্তমাখা আলামত, কাটা গ্রিল আর ডিএনএ রিপোর্ট উপস্থাপন করা হচ্ছিলো, তখন পুরো আদালত চত্বরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল রামিসার বাবা-মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের এজলাসে দিনভর ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা চলার সময় উপস্থিত আইনজীবী থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্যরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। মামলার এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষে আদালত আজ আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামীকাল বুধবার দিন ধার্য করেছেন।
মেয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা গুরুতর অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। কিন্তু কলিজার টুকরোর খুনিদের শেষ দেখার তীব্র আকুতি থেকে তিনি নিজেকে আর হাসপাতালে ধরে রাখতে পারেননি। সরাসরি হাসপাতাল থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে তিনি আজ এসে পৌঁছান আদালত প্রাঙ্গণে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে গিয়ে এই অভাগা বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেললে আদালতের নির্দেশে তাকে বসার জন্য একটি চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হান্নান মোল্লা আদালতকে জানান, ঘটনার দিন সকালে অফিসে যাওয়ার পর হঠাৎ তার স্ত্রী ফোন করে তাকে জরুরি ভিত্তিতে বাসায় আসতে বলেন। তীব্র উদ্বেগ নিয়ে বাসায় ফিরে তিনি দেখেন ফ্ল্যাটের সামনে প্রতিবেশীদের ভিড় এবং পাশের ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বারবার ধাক্কা দিয়েও কেউ দরজা না খোলায় তারা হাতুড়ি দিয়ে লক ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং টয়লেটের সামনে রক্তের দাগ দেখতে পান। এই দৃশ্য দেখার পর একজন বাবার বুকে যে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় উঠেছিল, তা বর্ণনা করার ভাষা আদালত কক্ষের কারও জানা ছিল না। বিকেলবেলা শুনানি শেষে আবারও সেই অ্যাম্বুলেন্সে করেই হাসপাতালে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি শুধু উচ্চস্বরে বলতে পেরেছেন, তিনি তার মেয়ের হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান।
দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে যখন রামিসার মা পারভীন আক্তার কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ান, তখন পুরো এজলাসে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি নিজের ঘরে রান্না করছিলেন এবং হঠাৎ একটি শিশুর তীব্র চিৎকার শুনতে পান। তবে সেটিকে পাশের বাসার কোনো শিশুর স্বাভাবিক কান্না ভেবে প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেননি। বেশ কিছু সময় পর মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে তিনি যখন চারদিকে হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন, তখন পাশের ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন। সেই মুহূর্তেই মায়ের বুক কেঁপে ওঠে এবং তার মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে শোনা সেই চিল-চিৎকারটি হয়তো তার নিজের মেয়েরই ছিল। পারভীন আক্তার জানান, তিনি বারবার প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তারকে বোন বলে ডাকলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাননি, যা তার সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই বেরিয়ে আসে সেই ভয়াবহ সত্য। মায়ের এই মর্মস্পর্শী জবানবন্দি চলাকালে ট্রাইব্যুনালের বাইরে থাকা সাংবাদিকদের চোখের কোণও অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। এদিকে রামিসার ছোট বোন রাইসা আক্তার অত্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কা হওয়ায় তার মানসিক সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে বিচারক ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বন্ধ কামরায় তার বক্তব্য রেকর্ড করার সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেন।
বিকেলের দিকে আদালতে তদন্তের সময় জব্দ করা কাটা গ্রিলসহ বিভিন্ন ভয়াবহ রক্তমাখা আলামত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো তুলে ধরার সময় রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষজ্ঞ সাক্ষী এসআই ইকবাল হোসেন নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। আট বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর চলা পৈশাচিকতার বিবরণ দিতে গিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা এজলাসের ভেতরেই কেঁদে ফেলেন, যা আদালতের পরিবেশকে আরও স্তব্ধ করে দেয়। অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে আদালতে হাজির করা হয় মূল ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। আগের দিন প্রধান আসামি সোহেল রানা প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় গণমাধ্যমের সামনে চিৎকার করে নাটকীয় বক্তব্য দেওয়ায় আজ পুলিশী তৎপরতা ছিল কয়েক গুণ বেশি। আদালত ভবন থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য ঘাতক দম্পতিকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখেন এবং সোহেল রানার মুখে শক্ত করে মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়। সাংবাদিকরা যেন তার কোনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য রেকর্ড করতে না পারেন, সেজন্য পুরো পথজুড়ে পুলিশ সদস্যরা মুহুর্মুহু বাঁশি বাজিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন।
আইনজীবী ও প্রসিকিউশন দল এই দ্রুততম শুনানিতে নিজেদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু শুনানির বিরতিতে সাংবাদিকদের বলেন, আজকের দীর্ঘ সাক্ষ্য ও জেরার মাধ্যমে মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অকাট্য ইনক্রিমিনেটিং এভিডেন্স বা অপরাধের প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের সামনে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে, যা দুই আসামির সরাসরি সংশ্লিষ্টতাকে পুরোপুরি প্রমাণ করে। ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুকও তার সুর মেলাবেন এবং দৃঢ়তার সাথে জানান যে, আসামিপক্ষ দীর্ঘক্ষণ জেরা করলেও সাক্ষীদের মূল ও মৌলিক বক্তব্য কোনোভাবেই খণ্ডন করতে পারেনি। সাক্ষীরা যা দেখেছেন এবং যে নির্মম পরিস্থিতিতে আলামতগুলো পেয়েছেন, তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আদালতের কাছে তুলে ধরেছেন। রামিসা আক্তারের এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের দ্রুততম বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন শুধু এক জোড়া বিচারপ্রার্থী বাবা-মায়ের নয়, বরং গোটা দেশবাসীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।