‘কতবার কইছি বইন দরজাটা খুল, সে খুলে নাই’: আদালতে রামিসার মায়ের আকুতি, সাক্ষী দিলেন বাবাও
প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালতে অশ্রুভেজা চোখে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার বাবা ও মা। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শিশুটির মা পারভীন আক্তার ও বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। সন্তান হারানোর এমন মর্মান্তিক বর্ণনা শুনে এজলাসে উপস্থিত সবার মাঝেই এক স্তব্ধতা নেমে আসে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় আবেগে প্রায় ভেঙে পড়া এই দম্পতিকে একপর্যায়ে বিচারকের নির্দেশে বসার জন্য চেয়ার দেওয়া হয়।
এদিন সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ও মানুষের ভিড় লক্ষ করা যায়। কারাগার থেকে মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে কঠোর পাহারায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠার ঠিক চার মিনিট পর প্রথম সাক্ষী হিসেবে কাঠগড়ায় ডাকা হয় মামলার বাদী ও নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাকে। তিনি তার জবানবন্দিতে ঘটনার দিন সকালের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি বনানীর কাকলী এলাকায় নিজের অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। অফিসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্ত্রী পারভীন আক্তার অত্যন্ত আকুল হয়ে ফোন করে জানান যে, ছোট মেয়ে রামিসাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই খবর পেয়ে তিনি দ্রুত অফিসের কাজ ফেলে বাসে চড়ে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে মিরপুরের বাসায় ফিরে আসেন।
বাসার সামনে এসে আব্দুল হান্নান দেখতে পান শত শত উৎসুক ও উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়। তীব্র আতঙ্ক বুকে নিয়ে তিনি যখন দৌড়ে নিজ ফ্ল্যাটের সামনে যান, তখন তার স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে জানান যে, পাশের ফ্ল্যাটে সোহেল ও স্বপ্নার ঘরের ভেতর রামিসাকে আটকে রাখা হয়েছে। তখন সেখানে রাজু নামের এক স্থানীয় যুবককে দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করতে দেখেন তিনি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হান্নান নিজেই নিচে দৌড়ে গিয়ে একটি হাতুড়ি জোগাড় করে আনেন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে দরজা ভাঙার চেষ্টা শুরু করেন। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিটের প্রাণপণ চেষ্টার পর দরজার তালাটি ভেঙে যায়। তালার ছিদ্র দিয়ে ভেতর তাকাতেই তারা আসামি স্বপ্নাকে দেখতে পান। ভেতরে প্রবেশ করার পর দেখা যায় ভেতরের কমন রুম ও বাথরুমের দরজা শক্ত করে বন্ধ এবং বাথরুমের সামনে ও ভেতরে ছোপ ছোপ তাজা রক্ত পড়ে আছে।
ভয়াবহ সেই দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে রামিসার বাবা বলেন, তারা যখন ঘরে ঢোকেন তখন আসামি স্বপ্না কোনো এক রহস্যময় কারণে একদম নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। যে ঘরে আসামিরা বসবাস করত, সেটিও বন্ধ ছিল। একপর্যায়ে উপস্থিত লোকজনের একজন ঘরের ভেতরের একটি স্টিলের খাট উঁচু করতেই নিচে রাখা একটি বালতি দেখতে পান। আর সেই বালতির ভেতরেই রাখা ছিল নিষ্পাপ শিশু রামিসার ক্ষতবিক্ষত মাথা। এই চরম নৃশংসতা সহ্য করতে না পেরে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন হতভাগ্য বাবা। পরে চেতনা ফিরে পাওয়ার পর তিনি থানায় গিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে লিখিত এজাহার দায়ের করেন।
এরপর আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে দীর্ঘ জেরা করেন। জেরায় বিবাদিপক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ঘটনার সময় রামিসার মা ঠিক কখন তাকে ফোন করেছিলেন এবং তাদের সঙ্গে আসামিদের কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল কি না। জবাবে আব্দুল হান্নান জানান, সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে তার স্ত্রী ফোন করেছিলেন এবং আসামিদের তিনি জীবনেও আগে কখনো দেখেননি, তাই কোনো পূর্বশত্রুতার প্রশ্নই ওঠে না। তার বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা অভিযোগের দাবি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, চোখের সামনে যতটুকু ধ্রুব সত্য দেখেছেন, ঠিক ততটুকুই আদালতের কাছে তুলে ধরেছেন।
বেলা ১১টায় বাবার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে কাঠগড়ায় আসেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। তাকে শপথ পড়ানোর পর ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন সকালে তিনি রান্নাঘরে দুপুরের রান্না করছিলেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাইসা আক্তার যখন পাশের বাসায় তার চাচার বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তখন ছোট মেয়ে রামিসাও বায়না ধরে সঙ্গে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পারভীন তাকে বারণ করে রান্নাঘরে চলে যান। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে একাই বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং মা ভেবেছিলেন রামিসা বোধহয় ঘরেই আছে। এর ৩-৪ মিনিট পরেই পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি বাচ্চার তীব্র চিৎকারের শব্দ শুনতে পান তিনি। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো পাশের ফ্ল্যাটেরই কোনো শিশু কাঁদছে, কারণ রামিসা যে ঘরে নেই তা তার খেয়াল ছিল না।
এর কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে রাইসা যখন একা বাসায় ফিরে আসে, তখন পারভীন চমকে উঠে জিজ্ঞেস করেন রামিসা কোথায়। রাইসা জানায় যে রামিসা তো তার সঙ্গে চাচার বাসায় যায়নি। এই কথা শুনেই পারভীনের মনে এক অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধে। তিনি পাগলের মতো চারদিকে রামিসাকে খুঁজতে শুরু করেন, প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করেন, কিন্তু কেউ কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। রামিসার একটি প্রিয় বিড়াল ছিল, তাই সে বিড়ালের পেছনে নিচে নেমে গেছে ভেবে তিনি নিচের অফিস ও দোতলার ব্যাচেলরদের মেসেও খোঁজ নেন। কোথাও না পেয়ে যখন তিনি তিন তলার সেই ফ্ল্যাটের সামনে যান এবং দরজা ধাক্কাধাক্কি করেন, তখন ভেতর থেকে কেউ সাড়া দেয়নি। ঠিক তখনই দরজার নিচে মেঝের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান তার মেয়ের এক পাটি জুতা পড়ে আছে।
মেয়ের জুতা দেখে পারভীন চিৎকার করে দরজা খোলার জন্য বারবার আঘাত করতে থাকেন। তার চিৎকার শুনে ভবনের ওপরের তলা থেকে মনি ও আসমাসহ অন্য প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পারভীন আক্তার আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তিনি দরজার বাইরে থেকে ভেতরের আসামি স্বপ্নাকে উদ্দেশ্য করে বারবার আকুতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘কতবার কইছি বইন দরজাটা খুল, তোর কিচ্ছু হবে না।’ কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। এরপর মনি নামের এক প্রতিবেশী নিচে গিয়ে আরও ১০-১২ জন লোক ডেকে আনেন এবং তালা ভেঙে ঘরে ঢোকার পর পুরো বাথরুম রক্তে ভাসতে দেখা যায়। ভেতরে আসামির ঘরের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং বালতিতে মাথা পাওয়ার বীভৎস ঘটনা বর্ণনা করার সময় আদালত কক্ষে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে এবং বড় বোন রাইসা আক্তার অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার জবানবন্দি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশেষ ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করেন বিচারক। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, সিআইডির আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা রয়েছেন। উল্লেখ্য, পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসাকে গত ১৯ মে সকালে ফুসলিয়ে নিজ কক্ষে নিয়ে যায় প্রতিবেশী স্বপ্না। এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালায় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। ঘটনার পরদিন ২০ মে পল্লবী থানায় মামলা হলে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ থেকে মূল আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে দুই আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র জমা দেন, যার প্রেক্ষিতে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।