‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি’— কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রামিসা হত্যার প্রধান আসামি সোহেলের চিৎকার
অনলাইন ডেস্ক:
মেধাবী ও চঞ্চল শিশু রামিসা ছিল পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। গত ১৯ মে রোজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চিরচেনা আবহে ঘর থেকে বের হয়েছিল সে। কিন্তু সে জানতো না, পাশের ফ্ল্যাটেই ওত পেতে আছে এক পৈশাচিক অন্ধকার। রামিসা বের হতেই প্রতিবেশি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের রুমের ভেতরে ডেকে নেয়। এর কিছুক্ষণ পর, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তার সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও না পেয়ে ব্যাকুল মা একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তারা যে দৃশ্য দেখেন, তা যেকোনো সুস্থ মানুষের পিঠের চামড়া ঠাণ্ডা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ, আর তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি রাখা ছিল ঘরের ভেতরের একটি বড় বালতিতে। এই চরম নৃশংসতার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং ঘর থেকে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার পরপরই জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় মূল ঘাতক সোহেল রানা। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই লোমহর্ষক ঘটনায় পরদিন বুধবার ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দিতে সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে গা শিউরে ওঠা বিবরণ দিয়েছিল। সে জানিয়েছিল, ঘটনার আগে সে ইয়াবা সেবন করেছিল। মাদক সেবনের পর বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করতে সে বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের তীব্রতায় শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, ঠিক সেই মুহূর্তেই রামিসার মা বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। ধরা পড়ার ভয়ে ও নিজের অপরাধ ঢাকতে সোহেল অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথাটি কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে। এরপর বাথরুম থেকে মরদেহটি এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। জবানবন্দিতে সে আরও স্বীকার করে যে, এই বীভৎস কাণ্ডের সময় তার স্ত্রী স্বপ্না একই রুমে উপস্থিত ছিলেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না।
এই জঘন্য মামলার তদন্ত কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে শেষ করে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট জমা দেন, যা পরবর্তীতে বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলি করা হয়। গত ২৪ মে আদালতের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিয়ে ১ জুন অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করেন।
নির্ধারিত দিনে আজ সোমবার সকাল পৌনে আটটার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যানে করে আসামিদের আদালতে আনা হয়। সোহেল রানাকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে নারী হাজতখানায় রাখা হয়। শুনানির সময় বেলা ১১টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের এজলাসে তোলা হয়। জনরোষ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও মাথায় হেলমেট পরিয়ে কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। এরপর যখন স্বপ্নাকে কাঠগড়ায় আনা হয়, তখন আতঙ্কে সে মারাত্মকভাবে হাঁপাতে থাকে এবং বারবার জ্ঞান হারাতে শুরু করে। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তার জ্যাকেট ও হেলমেট খুলে মুখে পানি ঢেলে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করেন। বেলা ১১টা ৯ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসন গ্রহণ করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে আনা বর্বরোচিত অপরাধের বিবরণ তুলে ধরে অভিযোগ গঠনের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ আসামিদের নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াই করেন। আদালত যখন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো পড়ে শোনান, তখন প্রধান আসামি সোহেল রানা কথা বলার চেষ্টা করলেও আদালত তাকে অনুমতি দেননি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পরদিনই অর্থাৎ ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য করেন। বেলা ১১টা ২৯ মিনিটে বিচারক এজলাস ত্যাগ করার পর কাঠগড়াতেই এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। সোহেল তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আশ্বস্ত করে বলে যে সে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে যেখানে স্বপ্নার কোনো দোষ নেই, তাই তার চিন্তা করার কিছু নেই। এরপর বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে স্বপ্নাকে হাজতখানায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
স্বপ্না চলে যাওয়ার পর কাঠগড়ায় একা দাঁড়িয়ে থাকা সোহেল রানা হঠাৎ উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে থাকে, সে ধর্ষণ করেনি, সে শুধু লাশ কেটেছে; ধর্ষণ করেছে ডলার নামে অন্য একজন। সে দাবি করে, মেয়েটিকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল। সে আরও বলে, সে পাপ করেছে এবং সেই পাপের শাস্তি সে মাথা পেতে নিতে রাজি আছে। তবে পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে থামিয়ে দেন এবং বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে তাকে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়। আদালত প্রাঙ্গণে আসামির এই আকস্মিক ও নাটকীয় দাবি প্রসঙ্গে বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু গণমাধ্যমকে জানান যে, পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে ‘ডলার’ নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব বা উল্লেখ নেই। আসামি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা-ই দাবি করুক না কেন, তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। আধুনিক বিচারিক নীতি অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ ট্রায়ালের বিষয়। রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত আশাবাদী যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি ঘটিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো রামিসাকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।