পুলিশ হেফাজতে আসামির বক্তব্য প্রচারে আদালতের কড়া নিষেধাজ্ঞা
মহানগর ডেস্ক: বিচারাধীন মামলার স্বচ্ছতা রক্ষা এবং জনমত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা ঠেকাতে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আদালত। এখন থেকে পুলিশ হেফাজতে থাকা কোনো আসামির বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করা যাবে না। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এই কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রাষ্ট্রপক্ষের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন। রাজধানীজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আট বছর বয়সী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে এই আদেশ আসে।
আদালত কক্ষের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি আদালতকে মনে করিয়ে দেন যে, দেশের প্রচলিত আইন এবং উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন বিচারকের সামনে দোষ স্বীকার বা জবানবন্দি না দিলে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামির দেওয়া কোনো বক্তব্যের আইনি ভিত্তি থাকে না। অথচ প্রায়ই দেখা যায়, তদন্তাধীন বা বিচারাধীন মামলায় পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামিদের নানা বক্তব্য গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এই ধরনের অপসাংবাদিকতা বা অসচেতন প্রচার শুধু যে আইনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে তা নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনে আগাম একটি ধারণার জন্ম দেয়, যা নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশনার বরাত দিয়ে তিনি ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের এই যুক্তি ও আবেদনের গভীরতা অনুধাবন করে বিচারক মাসরুর সালেকীন তা মঞ্জুর করেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই আদেশের ফলে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর আসামিদের গণমাধ্যমের সামনে হাজির করার প্রবণতায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।
এদিকে, এই আইনি নাটকীয়তার মধ্যেই একই আদালতে চাঞ্চল্যকর রামিসা হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে। আজ মামলার প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়, যেখানে নিহত শিশুটির বাবা ও মা আদালতে এসে অশ্রুসিক্ত চোখে সেই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তাঁদের পাশাপাশি মামলার আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীও আজ জবানবন্দি প্রদান করেন। এর আগে আদালত এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন। আদালতের আজকের এই দ্বিমুখী পদক্ষেপ—একদিকে একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে বিচারপ্রক্রিয়ার পবিত্রতা রক্ষায় গণমাধ্যমের ওপর আইনি লাগাম টানা—আইন অঙ্গনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।