মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যা: আদালতে বুকভাঙ্গা আর্তনাদ বাবার, সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০২:২৯ অপরাহ্ন   |   মহানগর

মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যা: আদালতে বুকভাঙ্গা আর্তনাদ বাবার, সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি

মহানগর ডেস্ক:

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় যে ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছিল, তা আজ যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে আদালত প্রাঙ্গণে। একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারিয়ে বুকভাঙ্গা আর্তনাদ নিয়ে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়েছেন হতভাগ্য বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার সর্বোচ্চ শাস্তি এবং দৃষ্টান্তমূলক ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।

মঙ্গলবার সকাল নয়টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার ঠিক আগেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের এই আকুতি জানান ভুক্তভোগীর পিতা। আধুনিক বিচারিক ব্যবস্থায় এই ধরণের জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সামাজিকভাবে কতটা জরুরি, তা আজ আদালত প্রাঙ্গণের থমথমে পরিবেশেই স্পষ্ট হচ্ছিল।


আজকের দিনটি এই মামলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজ আদালতে মামলার বেশ কয়েকজন অবিনাশী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করবেন। রাষ্ট্রপক্ষের এই সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন ঘটনার ম্যাজিস্ট্রেট, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, ক্রাইম সিনের আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীরা, যারা ঘটনার দিন নির্মম সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাক্ষীদের জবানবন্দি মামলার রায় কোন দিকে যাবে তা নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।

এর আগে, সকাল পৌনে নয়টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার সহযোগী ও স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। হাজির করার পর পরই তাদেরকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় কড়া পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছে। মাত্র একদিন আগেই, অর্থাৎ গতকাল সোমবার আদালত এই দম্পতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই দিন বিকেলে মামলার বাদীসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষীকে আজ আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় আজ সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় সাক্ষীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

এই মামলার বিচারিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এর আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। গত ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামির বিরুদ্ধে পুলিশ কর্তৃক দাখিল করা অভিযোগপত্রটি আমলে নেয়। এর আগে একই দিনে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মামলার সংবেদনশীলতা ও ভুক্তভোগীর বয়স বিবেচনা করে দ্রুত বিচারের স্বার্থে এটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।

মামলার এজাহার ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে প্রতিদিনের মতো ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজেদের রুমের ভেতরে ডেকে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পুরো বাড়ি খুঁজেও যখন মেয়ের সন্ধান মিলছিল না, তখন হঠাৎ করেই আসামির বন্ধ রুমের সামনে শিশুটির জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। সন্দেহবশত ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার মা-বাবা চিৎকার শুরু করেন। তাদের চিৎকারে ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে আসে এবং সকলে মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।


ভেতরে ঢুকে ঘরের দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে যান উপস্থিত সবাই। আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল শিশু রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ, আর তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি ঘরের এক কোণে রাখা একটি বড় বালতির ভেতরে লুকানো ছিল। এই নারকীয় ও পৈশাচিক দৃশ্য দেখে পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং বাসা থেকেই স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার মূল হোতা সোহেল রানা ততক্ষণে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় চিরুনি অভিযান চালায় পুলিশ। অবশেষে ঘটনার পরদিনই নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরদিন, ২০ মে ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আজ আদালতে দাঁড়িয়ে সেই বাবা কেবল নিজের মেয়ের হত্যার বিচারই চাননি, বরং সমাজের আর কোনও বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়, সেই সুশাসনের বার্তা দেখতে চেয়েছেন আদালতের রায়ে। এখন দেশবাসীর চোখ এই শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের দিকে, যেখানে নিষ্পাপ রামিসা হত্যার চূড়ান্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement