সেই খুনির নাম বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে’: বিস্ফোরক মমতা, নেপথ্যে অমিত শাহের ফোন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে পরাজয়ের ক্ষত তখনো দগদগে। কিন্তু কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার রাজনৈতিক মঞ্চে যখন তিনি দাঁড়ালেন, তখন তাঁর রুদ্রমূর্তি মনে করিয়ে দিল—পরাজয় আসতেই পারে, কিন্তু তেজ কমেনি বিন্দুমাত্র। তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার এক জনসভায় ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে নিশানা করতে গিয়ে এমন এক বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন, যার কম্পন সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশেও। ঢাকার একটি অত্যন্ত আলোচিত ও সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে মমতা সরাসরি দাবি করেছেন, সেই ঘটনার মূল রূপকারের নাম তাঁর জানা আছে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি এখনই সেই নাম প্রকাশ করছেন না। তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ, “আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে।”
বিধানসভা নির্বাচনের ধাক্কা সামলে এটিই ছিল ধর্মতলায় মমতার প্রথম বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি। আর প্রথম দিনই তিনি বেছে নিলেন এমন এক রণকৌশল, যা একাধারে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, আবার অন্যদিকে দুই দেশের ভূরাজনীতিতে এক নতুন রহস্যের জন্ম দেয়। দিল্লির বিজেপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করতে করতে মমতা হুট করেই চলে যান সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রসঙ্গে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথার ভান্ডার, তথ্যভান্ডার।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স বা এসটিএফের একটি পুরোনো ও চাঞ্চল্যকর অভিযান। জনসভায় সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তৃণমূল নেত্রী জানান, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা এক শীর্ষস্থানীয় খুনিকে মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করার পর রাজ্য পুলিশের এসটিএফ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গ্রেপ্তার করেছিল। ওই অপরাধীর কর্মকাণ্ড ও তাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অতীতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তাঁর নেই তা স্বীকার করেও মমতা দাবি করেন, রাজ্য পুলিশের এই সাফল্য ঢাকতে খোদ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসরে নেমেছিলেন।
সেই গোপন অধ্যায়ের পর্দা ফাঁস করে মমতা বলেন, খুনি গ্রেপ্তারের পর অমিত শাহ নিজে তাঁকে সরাসরি ফোন করেছিলেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে মমতা জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে বিষয়টি যেন কোনোভাবেই প্রকাশ্যে না আসে, সেই অনুরোধ করেছিলেন অমিত শাহ। এতদিন পর্যন্ত এই গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন বলে দাবি করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের ‘অত্যাচার’ ও চাপ চরমে পৌঁছানোর কারণেই তিনি আজ এই সত্য জনসমক্ষে আনতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান।
দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর ভারতের জাতীয় রাজনীতি তো বটেই, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মমতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশকে ভালোবাসেন এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই ওই নির্দিষ্ট খুনির পরিচয় বা নেপথ্যের কুশীলবদের নাম মুখে আনছেন না। তবে তাঁর এই একটি বক্তব্য দুই দেশের রাজনৈতিক অলিন্দে কোটি টাকার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে—কে সেই খুনি, আর কোন হত্যাকাণ্ডেরহ হদিস লুকিয়ে আছে দিল্লির ক্ষমতার করিডোরে, যার নাম প্রকাশ পেলে আক্ষরিক অর্থেই উত্তাল হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ? ধর্মতলার তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে মমতার এই হুঁশিয়ারি আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সমীকরণে কোনো নতুন মোড় আনে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।