জনবল সংকট, দাদনের ফাঁদ ও আইনের দুর্বলতায় চাপে সুন্দরবন

 প্রকাশ: ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১৩ অপরাহ্ন   |   খুলনা

জনবল সংকট, দাদনের ফাঁদ ও আইনের দুর্বলতায় চাপে সুন্দরবন

মাসুদ আল হাসান , খুলনা :

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে অপরাধ দমনে অভিযান জোরদার হলেও সংকট কাটছে না। বন বিভাগ বলছে, জনবল সংকট, দাদনভিত্তিক অর্থায়নে পরিচালিত অপরাধচক্র এবং বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খুলনা রেঞ্জে বনদস্যু, চোরা শিকারি ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারকারী চক্রের তৎপরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা রেঞ্জে অনুমোদিত ৬৪৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৪২৩ জন বনকর্মী। দীর্ঘদিন ধরে ২২১টি পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল বনাঞ্চলে টহল ও নজরদারি চালাতে হচ্ছে। অনেক বন স্টেশনে আধুনিক নৌযান ও পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবও কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কীটনাশক ব্যবহার করে মাছ শিকারের প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নেওয়া অনেক জেলে দ্রুত লাভের আশায় নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে নদী ও খালে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত কীটনাশক ছড়িয়ে মাছ ধরছে। এতে শুধু জলজ প্রাণী নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুলনা রেঞ্জে বন আইনে ২৯৪টি মামলা হয়েছে এবং ৩৯৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ প্রবেশের ১০৬টি, বিষ প্রয়োগের ৩৩টি এবং হরিণ শিকারের ৩৩টি মামলা রয়েছে। অভিযানে ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা, প্রায় সাত হাজার আটন, হরিণ ধরার ফাঁদ, হরিণের মাংস, মাছ, কাঁকড়া, মধু এবং ৮৭ বোতল বিষাক্ত কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৩৫ জন চিহ্নিত শিকারির একটি রেড লিস্ট তৈরি করে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়রায় স্থায়ী নিরাপত্তা চেকপোস্ট না থাকায় দক্ষিণ বেদকাশী, কাটকাটা, মহেশ্বরীপুর ও দাকোপের বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে বনজ সম্পদ সহজেই পাচার হচ্ছে।

কয়রা উপজেলা সুন্দরবন ও পরিবেশ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি আবু হাসান সরদার বলেন, বন বিভাগের জনবল ও অস্ত্রের ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন, ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং এসব অপরাধের অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

কয়রা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অপরাধ জামিন-অযোগ্য হলেও বিচারিক বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা জামিন পেয়ে যান। তাঁর মতে, বর্তমান বন আইন আরও কঠোর ও সময়োপযোগী করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ খেলে তীব্র খাদ্যবিষক্রিয়া, শ্বাসকষ্ট, লিভার ও কিডনির ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এ ধরনের মাছ বিশেষভাবে বিপজ্জনক।

খুলনা জেলা ডি-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আমির হামজা জানান, দক্ষিণ বেদকাশী, কাটকাটা, শাকবাড়িয়া ও আমাদী নৌ পুলিশ ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল ও চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় পায়ে হেঁটে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অনেক সময় অস্ত্রধারী অপরাধীদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান প্রতিদিনের দেশকে বলেন, ড্রোন প্রযুক্তি ও ফুট পেট্রোলিংয়ের সমন্বয়ে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। বনজ সম্পদ রক্ষায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement