খুলনায় আবারও জলাবদ্ধতা, প্রশ্নের মুখে ৮২৩ কোটি টাকার ড্রেনেজ প্রকল্প
মাসদ আল হাসান , খুলনা :
টানা বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে খুলনা মহানগর। হাঁটুসমান পানি জমেছে নগরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায়। দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকসহ সাধারণ নগরবাসী।
খুলনা আবহাওয়া অফিস জানায়, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৭৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মাত্র আট দিন আগে, ১ জুলাই ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
নগরবাসীর অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও বাস্তবে দুর্ভোগ কমেনি। প্রকল্পের আওতায় সাতটি খাল খনন এবং ১৬৯টি নতুন ড্রেনসহ দুই শতাধিক ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের অনেক এলাকা ডুবে যাচ্ছে।
৬ নম্বর ওয়ার্ডের কবীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর শেখ বলেন, আগে বৃষ্টির পানি একদিনের মধ্যে নেমে যেত, এখন সাত-আট দিন পর্যন্ত জমে থাকে। সড়ক ও ড্রেন উঁচু করলেও বাড়ি থেকে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাড়ি ছোট ছোট পুকুরে পরিণত হয়েছে।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তুহারা কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী আব্দুর রব বলেন, বর্ষা এলেই বাজার হাঁটুসমান পানিতে ডুবে যায়। এতে ক্রেতা কমে যাওয়ায় তাঁর ব্যবসা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। বাজারসংলগ্ন বড় ড্রেনের সংস্কারকাজ দীর্ঘদিন ধরে চলায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতার সমাধান হয় না। কোথা থেকে পানি আসবে, কোথায় যাবে এবং খালের ধারণক্ষমতা কত—এসব বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকায় প্রকল্পের সুফল মিলছে না।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে তালতলা খালসহ অন্তত ১৩টি বড় খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানির ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
নাগরিক নেত্রী অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, খাল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নদী-খাল ভরাট, জলাধার দখল এবং জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানি শহরে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি শ্রেণিকক্ষও বুধবার রাতের বৃষ্টিতে হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, নতুন ঢাকনাযুক্ত কংক্রিটের ড্রেন পরিষ্কার করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ড্রেনে প্লাস্টিক ও বর্জ্য জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, নগরে প্রায় ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। 'খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়)' প্রকল্পের আওতায় ১৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৬৯টি নতুন ঢাকনাযুক্ত ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ও কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পনা অনুযায়ী ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে কেসিসির প্রধান কনজারভেন্সি কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, নতুন ঢাকনাযুক্ত ড্রেন পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণে সময় লাগছে। চলমান প্রকল্পের আওতায় এসব যন্ত্র কেনার ব্যবস্থা রয়েছে।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের (সিইপিআর) চেয়ারম্যান গৌরঙ্গ নন্দী বলেন, খুলনার জলাবদ্ধতা মূলত পরিকল্পনাগত সংকটের ফল। শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ নয়, প্রাকৃতিক খালের ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নদী-খালের সঙ্গে নগরের নিষ্কাশনব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত না হলে জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত বাড়লে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে।