ইরানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বিশ্ববাজারে বাড়ছে চাপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের ওপর নতুন করে বড় পরিসরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির তেল-গ্যাস, নৌপরিবহন, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি, সোনা ও ডিজিটাল সম্পদ খাতকে লক্ষ্য করে নেওয়া এই পদক্ষেপকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ, জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ইরানের ওপর বড় পরিসরে নতুন নিষেধাজ্ঞা
সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধও চলছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের তেল ও গ্যাসসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎসগুলোকে লক্ষ্য করেই এবারের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।
যেসব খাত নিষেধাজ্ঞার আওতায়
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন পদক্ষেপে ইরানের বিমান চলাচল, ডিজিটাল সম্পদ, সোনা, প্রযুক্তি ও নৌপরিবহন খাতকে লক্ষ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬০ ব্যক্তি ও জাহাজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সিঙ্গাপুর, চীন ও হংকংভিত্তিক বা এসব দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি জাহাজও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে।
ইরানের বাণিজ্যে বাড়ছে চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, নতুন পদক্ষেপের বড় একটি অংশ আগের নিষেধাজ্ঞারই ধারাবাহিকতা। মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়া।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সোনায় নজর যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর বা আইআরজিসি এবং ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় ইরান নিজের মুদ্রার মূল্য ধরে রাখতেও সোনা ব্যবহার করেছে বলে দাবি মার্কিন কর্মকর্তাদের।
নৌপরিবহন ও প্রযুক্তি খাতেও কড়াকড়ি
নতুন নৌপরিবহন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের রাষ্ট্রীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এসব জাহাজ তেল ও সংবেদনশীল অস্ত্রের যন্ত্রাংশ পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ইরানের অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ সীমিত করা।
বিমান চলাচল খাতেও এমন কয়েকটি ইরানি বিমান সংস্থাকে লক্ষ্য করা হয়েছে, যেগুলো অস্ত্র, সামরিক সদস্য ও ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য অর্থ পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।
সাধারণ ইরানিদের ওপরও পড়তে পারে প্রভাব
নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরানের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞার কিছু ব্যাপক ছাড়ও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন।
এর মধ্যে শিক্ষা বিনিময়, ব্যক্তিগত অর্থ স্থানান্তর এবং কিছু ক্রীড়া কার্যক্রমের সুযোগ ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু ইরান সরকারের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাধারণ ইরানিদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও এর চাপ পড়তে পারে।
১৯৭৯ সাল থেকেই ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করার ঘটনার পর ওয়াশিংটন প্রথম বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
পরবর্তী কয়েক দশকে ধাপে ধাপে এসব নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি হওয়ার পর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর পুরোনো নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পাশাপাশি নতুন নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়।
চীনের ওপরও বাড়তে পারে চাপ
ইরানের অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে, যা ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ।
ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরান নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
এ কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের তেল রপ্তানিতে চাপ এবং চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব জ্বালানি, পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের দামেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে তেলের দাম বাড়লে বিমানভাড়া, পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে পেট্রলের দাম
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ দশমিক ০৯ ডলার। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার দিন এই দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি নিষেধাজ্ঞার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে হামলা বাড়ায় কিংবা তেল রপ্তানি আরও কমে যায়, তাহলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
সোনার দাম বাড়লেও কমেছে তেলের দাম
নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সোনার দাম সোমবার মধ্যদুপুরের লেনদেনে ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৬৩৯ দশমিক ৪৯ ডলারে পৌঁছায়।
অন্যদিকে টানা দুই সপ্তাহ দাম বাড়ার পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার ২ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২২ ডলারে নেমে আসে।
ওয়াল স্ট্রিটেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া
নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে মার্কিন শেয়ারবাজারেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সোমবার নাসডাক ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। তবে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
তেল কোম্পানিগুলোর শেয়ারে তুলনামূলক বেশি চাপ দেখা যায়। শেভরনের শেয়ার ০ দশমিক ৮ শতাংশ, এক্সনমোবিল ০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বিপির শেয়ার ২ শতাংশের বেশি কমেছে। শেলের শেয়ার কমেছে ০ দশমিক ২ শতাংশ।
সামনে আরও বাড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা শুধু তেহরানের অর্থনীতির ওপরই চাপ তৈরি করছে না; এর প্রভাব ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয়, পণ্য সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানি ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা