নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আগে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান সরকার। যুদ্ধ, মার্কিন অবরোধ ও অর্থনৈতিক সংকটের চাপে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তেহরান। তবে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কায় সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ইরানের ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জন্য জ্বালানিতে ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সেই ব্যয়কে সরকারের জন্য ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ধারণা করছে, ২০২৬ সালে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হবে।
ইরানে জ্বালানির দাম বাড়ানো নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৯ সালে পেট্রলের দাম বাড়ানোর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভের কয়েক সপ্তাহ আগেও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছিল।
এ কারণে এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে সরকার। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
রোববার সকালে এক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, দেশের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে তাঁর ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান ছয় মাসের যুদ্ধে ‘শত্রুপক্ষ’ও সরকারের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে।
এর মধ্যেই ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দর রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে চূর্ণকারী অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর হুমকি দেওয়ার পর রোববার তেহরানের খোলাবাজারে এক ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়ালে উঠে যায়।
শুক্রবার পেজেশকিয়ান বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় ইরানে জ্বালানির দাম অনেক কম। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির শোধনাগারে প্রতি লিটার পেট্রল উৎপাদনে সরকারের খরচ ১৩ লাখ রিয়াল, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৬৫ সেন্ট। অথচ সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে কম দামের স্তরে প্রতি লিটার পেট্রল বিক্রি হয় মাত্র ১৫ হাজার রিয়ালে, যা এক সেন্টেরও কম।
ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য আরও দুটি মূল্যস্তর রয়েছে—প্রতি লিটার ৩০ হাজার ও ৫০ হাজার রিয়াল। আমদানি করা, ফ্রি-জোনের কিংবা নতুন নিবন্ধিত গাড়ির মালিকদের জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ দামের স্তর।
তবে ভর্তুকির জ্বালানি কেনার পরিমাণও নির্দিষ্ট। প্রতিটি মূল্যস্তরের জন্য মাসিক কোটা রয়েছে এবং জ্বালানি কিনতে ফুয়েল কার্ড ব্যবহার করতে হয়। সবচেয়ে কম দামের স্তরে মাসে ৬০ লিটার জ্বালানি কেনা যায়।
চলতি ইরানি বছরের শুরুতে, মার্চের শেষ দিকে, দ্বিতীয় মূল্যস্তরের মাসিক কোটা ১০০ লিটার থেকে কমিয়ে ৭০ লিটার করা হয়। জুলাইয়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের নতুন করে সংঘাতের পর তা আরও কমিয়ে ৫০ লিটার করা হয়েছে।
বর্তমানে ইরানে প্রতিদিন প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহার হয়। চলতি মাসের শুরুতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ লিটার।
ঘাটতি সামাল দিতে সরকার শোধনাগারে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ব্যবহার এবং জ্বালানির মান কমিয়ে তা পাতলা করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিও বন্ধ রয়েছে।
তিনটি বিকল্প, কোনোটিই স্বস্তিদায়ক নয়
ইরানের জ্বালানি দক্ষতা বিষয়ক সংস্থার প্রধান ইসমাইল সাঘাব-এসফাহানি গত সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরকারের সামনে থাকা তিনটি বিকল্পের কথা জানিয়েছেন।
প্রথম বিকল্পে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকবে। তবে প্রতিটি পাম্পে বরাদ্দ করা জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় বিকল্পে গাড়ি থাকুক বা না থাকুক, প্রত্যেক ইরানিকে মাসে প্রায় ৩০ লিটার জ্বালানি সবচেয়ে কম দামের স্তরে দেওয়া হবে। গাড়ি নেই এমন কেউ চাইলে নিজের বরাদ্দ বিক্রি করতে পারবেন।
তৃতীয় বিকল্প হলো সবার জন্য জ্বালানির দাম বাজারমুখী করা। এ ক্ষেত্রে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ৮ লাখ ৭২ হাজার রিয়াল বা প্রায় ৪৪ সেন্ট করার কথা বিবেচনা করছে সরকার।
তবে এ সিদ্ধান্তের বড় ঝুঁকি মূল্যস্ফীতি। জ্বালানির দাম এক ধাক্কায় বাড়লে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
এই দাম শোধনাগারে জ্বালানি উৎপাদনের খরচের কাছাকাছি। দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের কেরমান প্রদেশে এর কাছাকাছি একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ১৩ আগস্ট রাত থেকে প্রদেশটির ২০৪টি পাম্পে নতুন দাম কার্যকরের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সরকার সেই উদ্যোগ বাতিল করে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নতুন দাম কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার পরে তা নাকচ করে জানায়, এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি।
তবু জ্বালানির দাম বড় পরিসরে বাড়ানোর প্রস্তুতির ইঙ্গিত স্পষ্ট। শুক্রবার প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-রেজা আরেফ বলেন, ৬০ লিটারের কোটা-সহ সবচেয়ে কম দামের স্তরটি চালু রাখতে হবে। তবে দ্বিতীয় স্তরের কোটা ধীরে ধীরে কমানো যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাজারমুখী করে সেখান থেকে পাওয়া অর্থ দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য ব্যয় করার কথা বলেন তিনি।
জ্বালানির দাম বাড়লেই বাড়বে সবকিছুর খরচ
তবে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের যুক্তি খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিম তেহরানের একটি পোশাকের দোকানে কাজ করা মোস্তফা মাসে ৩০ কোটি রিয়াল বা প্রায় ১৫০ ডলার আয় করেন।
তিনি বলেন, ১৫ বছর পুরোনো ইরানি গাড়িতে কর্মস্থলে যাতায়াতের জ্বালানি খরচ তাঁর মাসিক ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ নয়। কিন্তু কয়েক মাসের যুদ্ধ, অবরোধ, কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং সরকারের ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপের মধ্যে বাসা, খাবারসহ অন্যান্য ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের জুলাইয়ের হিসাবে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে পণ্যের দাম ৮৮ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ১২৮ শতাংশ।
অনলাইন রাইড-হেইলিং সেবায় চালক হিসেবে কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি আল জাজিরাকে বলেন, যাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তায় প্রায়ই জীবনযাত্রার অবনতি নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশার কথা উঠে আসে।
তাঁর আশঙ্কা, জ্বালানির দাম বাড়লে কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছুর দাম আরও বেড়ে যাবে। তাঁর ভাষায়, বর্তমান বাজারদরেই মানুষ ‘পিষ্ট’ হয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা