সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা, তুরস্ককে উসকানির অভিযোগ

 প্রকাশ: ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা, তুরস্ককে উসকানির অভিযোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

সিরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি গাড়িতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটিতে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলা তুরস্ককে সংঘাতে জড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত।

শনিবার সিরিয়ার সরকারি আল-ইখবারিয়া চ্যানেল জানায়, দামেস্কের উপকণ্ঠের বাইত জিন শহরের কাছে একটি বেসামরিক গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন আঘাত হানে। এতে এক ব্যক্তি আহত হন।

সিরিয়ার পররাষ্ট্র ও প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রণালয় বেসামরিক গাড়িতে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এতে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। তাদের ভাষায়, এই হামলা সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং আন্তর্জাতিক আইনেরও সরাসরি পরিপন্থী।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হামলার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, দক্ষিণ সিরিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে থাকা এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ওই ব্যক্তির কর্মকাণ্ড ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল বলেও দাবি করেছে তারা।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সিরিয়ায় শত শত হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গোলান মালভূমিতে ইসরায়েল ও সিরিয়ার সেনাদের কয়েক দশক ধরে আলাদা রাখা জাতিসংঘ-নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনেও ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

তুরস্ককে সংঘাতে টানার চেষ্টা?

মঙ্গলবার সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলের দাবি ছিল, সেখানে তুরস্ক সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে দামেস্ক ও আঙ্কারা—দুই পক্ষই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক ওই হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।

শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ব্যারাক বলেন, হামলাটি ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে তুরস্ককে সংঘাতে জড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, একটি সম্ভাবনা হলো ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে তুরস্ককে উসকে দিতে চেয়েছিল। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত আগ্রাসী হলেও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি কৌশল হতে পারে।

ব্যারাক আরও জানান, আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলার আগে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেনি।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ শনিবার ব্যারাকের মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, মার্কিন দূতের বক্তব্যে ‘অনেক ভুল তথ্য’ রয়েছে।

দক্ষিণ সিরিয়াকে নিরাপত্তা অঞ্চল মনে করছে ইসরায়েল

আল জাজিরার আরবি বিভাগের প্রতিবেদক আদহাম আবু আল-হুসামের তথ্য অনুযায়ী, বাইত জিনের কৃষিজমি ও শহরের মধ্যবর্তী প্রধান সড়কে একটি ছোট পণ্যবাহী ট্রাককে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে তিনি জানান, আহতদের একজন ট্রাকচালক, যিনি পণ্য ও বিভিন্ন অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা আহত এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসাসূত্র জানিয়েছে, তাঁর ডান হাতে আঘাত লেগেছে এবং তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।

বাসিন্দারা গত চার দিন ধরে ওই এলাকায় ইসরায়েলি নজরদারি ড্রোন উড়তে দেখেছেন বলেও জানান। দামেস্ক থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরের বাইত জিন গত এক বছরে একাধিকবার ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য হয়েছে। গত নভেম্বরের একটি অভিযানে সেখানে ১৩ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

দামেস্কভিত্তিক ওমরান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের নিরাপত্তা ও কৌশলবিষয়ক গবেষক মুহসেন আল-মুস্তাফা বলেন, সর্বশেষ হামলাটি সিরীয় সরকারের প্রতি ইসরায়েলের একটি বার্তা হতে পারে।

তাঁর মতে, ইসরায়েল বর্তমানে সিরিয়াকে, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলকে, এমন একটি নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে দেখছে যেখানে তারা নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়াতে চাইছে।

আল-মুস্তাফা বলেন, কয়েক দিন আগের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলাতেও ইসরায়েল একই যুক্তি দেখিয়েছিল-তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ঠেকানো।

তাঁর মতে, এর মাধ্যমে ইসরায়েল বোঝাতে চাইছে যে তারা যে নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করতে চাইছে, তা শুধু সিরিয়ার দক্ষিণে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির প্রায় মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটি পর্যন্ত সেই পরিধি বিস্তৃত বলে ইসরায়েলের অবস্থান থেকে ইঙ্গিত মিলছে।

নভেম্বরে বাইত জিনে ইসরায়েলি সেনারা স্থল অভিযানে গিয়ে সরাসরি গুলির মুখে পড়েছিল। এতে ছয় ইসরায়েলি সেনা আহত হন, যাদের তিনজন গুরুতর আহত ছিলেন। এ কারণে সর্বশেষ অভিযানে স্থলবাহিনীর বদলে ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন আল-মুস্তাফা।

তাঁর মতে, ইসরায়েল প্রতিটি আলোচনার পর্যায়ে চাপ বাড়িয়ে আরও বেশি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সমঝোতার চেষ্টা

সিরিয়ার এক কূটনৈতিক সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, দামেস্ক উত্তেজনা কমানোর অবস্থানে অটল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে সিরিয়া। এর ভিত্তি হিসেবে ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নতা চুক্তিকে ধরা হচ্ছে।

এদিকে শনিবার ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতারও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই হামলা অগ্রহণযোগ্য আগ্রাসন, সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

কাতার বর্তমান সিরীয় সরকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেছে, আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ইসরায়েলের ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘন করা একটি বিপজ্জনক ও অগ্রহণযোগ্য উত্তেজনাকর নীতি। এটি আন্তর্জাতিক আইনের বিধানের প্রতিও অবজ্ঞা।

সূত্র: আলজাজিরা