তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত, বাড়ছে টানাপোড়েন

 প্রকাশ: ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত, বাড়ছে টানাপোড়েন

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চললেও সফরের অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গা হয়ে আছে ভারতে নির্বাসনে থাকা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি।

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়েছিলেন তারেক রহমান। কিন্তু গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই সংবাদ সম্মেলনের কারণে সফরের পরিবেশ ‘বিষাক্ত’ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য এখন একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন।

কেন আটকে গেল সফর

আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে চলতি মাসেই তারেক রহমানকে একক সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের মধ্যে বেশ কয়েক দফা যোগাযোগও হয়েছে।

ভারত বিরল এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিজেপির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নিজেদের দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। গত মঙ্গলবার তিনি তারেক রহমানের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভারত অতীত ভুলে যেতে বলছে না। বরং অতীতের মতপার্থক্যগুলো মিটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের এক অনুষ্ঠানে ত্রিবেদী বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানের ভারত সফরকে ‘স্মরণীয়’ করতে চান।

কিন্তু ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনের পর সেই পরিকল্পনা ধাক্কা খায়। বাংলাদেশ এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে। ভারত জানিয়েছে, ওই আয়োজনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।

দুই দেশের বক্তব্য কী

তারেক রহমানের সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লি-দুই পক্ষই এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সফর সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, এ মুহূর্তে তাঁর বলার মতো কিছু নেই।

শনিবার এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে। দুই দেশের স্বার্থই এতে বিবেচনায় রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর আয়োজনের জন্য ঢাকার কোনো তাড়া নেই। বাংলাদেশ এখনো বোঝার চেষ্টা করছে, নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক চায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা ভারতকে যথাযথভাবে বুঝতে হবে। ওই আন্দোলনে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও এতে জড়িয়ে আছে। এর আগে চলতি মাসে ভারত জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিবেচনা করছে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে এতে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।

শেখ হাসিনাই বড় বিরোধের জায়গা

বাংলাদেশের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু। হাসিনার সরকার দীর্ঘদিন ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তাঁর সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির সমর্থনও বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল।

হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর ভারতে অবস্থান এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে ঢাকা।

৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসার কথাও বলেন। ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের অনুরোধ বাস্তবায়নে তারা ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

ঢাকা একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণের কথাও জানিয়েছে। সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কথা বলেছে সরকার।

ভারতের উদ্বেগও কম নয়

নয়াদিল্লির জন্য বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোও বড় কূটনৈতিক উদ্বেগের বিষয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভারতের।

ঢাকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আহমেদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সঙ্গে এমন সম্পর্ক চায়, যেখানে আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তারেক রহমানের সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরও বৈচিত্র্যময় করছে।

আহমেদের মতে, ভারত একসময় বাংলাদেশকে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির অনুসারী হিসেবে দেখত। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ছাড় দিলেও নতুন সরকারের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না।

দুই দেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে ভারতের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগও দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণ। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য ঢাকার ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করছে, ভারত তাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ অভিযোগ করছে, কূটনৈতিক যাচাই ছাড়াই অনেককে জোর করে দেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ কী

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজের মতে, তারেক রহমান নিজের দেশের জনমতের কথা মাথায় রেখেই ভারত সফর পিছিয়ে দিচ্ছেন।

তবে তাঁর মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হলেও দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে এই ইস্যুর বাইরে যেতে হবে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব বাড়াতে আগ্রহী বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অধ্যাপক শ্রীধারা দত্ত মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকতে পারে না।

তাঁর মতে, শুধু সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর হবে না। দুই দেশের প্রাথমিক সৌহার্দ্য জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের চাপে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এখন নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।

দত্তের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের মতো নতুন বাংলাদেশ সরকার ভারতের প্রতি একই ধরনের উষ্ণতা দেখাবে না-এটাই বাস্তবতা। তবে প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আবেগের চেয়ে পারস্পরিক স্বার্থ ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে ভিত্তি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।