কিমের মাকে ঘিরে গোপন রহস্য আজও অমীমাংসিত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন ক্ষমতায় আসার প্রায় ১৫ বছর পার করলেও তিনি কখনোই প্রকাশ্যে তাঁর মা কো ইয়ং হুইয়ের নাম উচ্চারণ করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে দেশটির শাসনব্যবস্থার বৈধতার সঙ্গে জড়িত একটি স্পর্শকাতর বাস্তবতা।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় কিম পরিবারের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তথাকথিত ‘মাউন্ট প্যাকতু রক্তধারা’র ওপর। রাষ্ট্রীয় বর্ণনায় দাবি করা হয়, কোরীয় জাতির পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের জন্ম প্যাকতু পর্বতে। একই সঙ্গে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং জাপানবিরোধী সংগ্রামের সময় এই পর্বতকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এবং তাঁর ছেলে কিম জং ইলের জন্মও সেখানে হয়েছিল বলে প্রচার করা হয়। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, কিম জং ইলের প্রকৃত জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়।
এই ঐতিহ্যগত বংশপরিচয়ের বিপরীতে কিম জং উনের মা কো ইয়ং হুইয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকায়। তাঁর পরিবার মূলত বর্তমান দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের বাসিন্দা ছিল। জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূত পরিবার হিসেবে তারা পরে উত্তর কোরিয়ায় অভিবাসন করেন।
১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে জাপান থেকে প্রায় ৯৩ হাজার কোরীয় উত্তর কোরিয়ায় পুনর্বাসিত হন। তবে উত্তর কোরিয়ার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ‘সংবুন’ ব্যবস্থায় এই অভিবাসীদের ‘জ্জায়েপো’ নামে পরিচিত একটি নিম্ন মর্যাদার গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। রাষ্ট্র তাদের বিদেশি প্রভাবের বাহক হিসেবে দেখত এবং শিক্ষা ও চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে হতো। বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি পটভূমি শাসক পরিবারের প্রচারিত ‘প্যাকতু রক্তধারা’র ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কো ইয়ং হুই উত্তর কোরিয়ার অভিজাত মানসুদে শিল্পদলের নৃত্যশিল্পী ছিলেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে কিম জং ইলের পরিচয় হয়। সে সময় কিম জং ইলের বৈধ স্ত্রী ছিলেন কিম ইয়ং সুক। এছাড়া তাঁর আরও উপপত্নী ছিলেন। কো ইয়ং হুইকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাঁদের তিন সন্তান—কিম জং চুল, কিম জং উন ও কিম ইয়ো জং—রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে উনসানে বড় হন।
গবেষকদের মতে, কিম ইল সুং কখনো কো ইয়ং হুই কিংবা তাঁর সন্তানদের প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেননি। যদি তিনি তাঁদের গ্রহণ করতেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় তাঁদের ছবি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। তবে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর কিম জং ইল ক্ষমতায় এলে কো ইয়ং হুই কার্যত দেশের ‘ফার্স্ট লেডি’র ভূমিকা পালন করেন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে তাঁর সঙ্গে অংশ নেন।
২০০৪ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কো ইয়ং হুই মারা যান। তাঁর মৃত্যু নিয়েও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয়নি।
কিম জং ইলের একাধিক সন্তানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কিম জং উন উত্তরসূরি হন। বৈধ স্ত্রী কিম ইয়ং সুকের সন্তানরা ছিলেন কন্যা। বড় ছেলে কিম জং নাম পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়ার উত্তরাধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেন এবং সংস্কারের পক্ষে মত দেন। পরে তিনি নির্বাসিত জীবনযাপন করেন এবং ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় নার্ভ এজেন্ট হামলায় নিহত হন। অন্যদিকে বড় ভাই কিম জং চুলকে নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়নি বলে বিভিন্ন গবেষক উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজের পারিবারিক পটভূমি নিয়ে সংবেদনশীলতার কারণেই কিম জং উন ক্ষমতায় আসার পর শুরু থেকেই স্ত্রী রি সল জু ও কন্যা জু অ্যেকে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। তাঁদের মাধ্যমে শাসক পরিবারের একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থিতিশীল পারিবারিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
গবেষকদের ভাষ্য, যদি উত্তর কোরিয়ার জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে কিম জং উনের মা জাপানে জন্ম নেওয়া কোরীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী পরিবারের সদস্য ছিলেন, তবে তা দেশটির উত্তরাধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। সে কারণেই কো ইয়ং হুইকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় নীরবতা আজও অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি