স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসছে কঠোর আচরণবিধি, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই চূড়ান্ত হতে পারে খসড়া

 প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১২:৫০ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসছে কঠোর আচরণবিধি, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই চূড়ান্ত হতে পারে খসড়া

রিপোর্টার:

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধি আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়ার ওপর রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত সংগ্রহ শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে কমিশন সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে এটি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এবার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদএই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আচরণবিধির খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এসব খসড়া কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি নিবন্ধিত ৫৬টি রাজনৈতিক দলের কাছেও পাঠানো হয়েছে। মতামত দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ জুন।

তবে খসড়া চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাদা কোনো সংলাপে বসার পরিকল্পনা নেই কমিশনের।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণবিধি সংশোধন করা হয়েছিল। সে সময় দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের পর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আচরণবিধিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ৩০ জুনের মধ্যে মতামত সংগ্রহ সম্পন্ন হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কমিশন।

তিনি জানান, আচরণবিধি চূড়ান্ত হওয়ার পর কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতির কাজ বাকি থাকবে। ভোটার তালিকা ও ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রায় প্রস্তুত। নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ শেষ করে আগস্টের মধ্যে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর এক মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।

ইসি ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, আগামী অক্টোবর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। এ জন্য আগস্টে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় ৪০০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

খসড়ায় যেসব নতুন বিধান থাকছে

নতুন আচরণবিধিতে বেশ কিছু কঠোর শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় কমানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, পোস্টার নিষিদ্ধকরণ এবং মাইক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদের আচরণবিধিতে ৩৩টি সাধারণ ধারা রাখা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একটি ধারা সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকে ভোটগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি অফিস ও সরকারি যানবাহন ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রার্থী বা তাদের মনোনীত এজেন্ট আচরণবিধি ভঙ্গ করলে লিখিত আদেশের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।

শাস্তি ও জরিমানা বৃদ্ধি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য বিদ্যমান ছয় মাসের কারাদণ্ড বহাল থাকলেও জরিমানার পরিমাণ ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান বহাল থাকবে।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করলেও শাস্তির আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে।

প্রচারণার সময় কমছে

বর্তমানে দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রচারণা চালানোর সুযোগ থাকলেও নতুন খসড়ায় সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহারের অনুমতি থাকছে না। তবে পচনশীল উপকরণ দিয়ে তৈরি লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে। একই ধরনের উপকরণ দিয়ে তৈরি ডিজিটাল ক্যারাভ্যানও প্রচারণায় ব্যবহার করা যাবে, তবে তা যেন যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

মাইক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ

খসড়া অনুযায়ী, প্রতি ওয়ার্ডে মাত্র একটি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে এবং সেটিও দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ ডেসিবেল।

অনলাইন প্রচারণা চালাতে আগ্রহী প্রার্থীদের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, প্ল্যাটফর্ম ও ই-মেইল ঠিকানা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নিবন্ধন করতে হবে।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

ভোটকেন্দ্র ও বিলবোর্ড ব্যবহারে নতুন নিয়ম

নতুন বিধিমালায় ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটার স্লিপের নির্দিষ্ট আকারও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

সীমিত পরিসরে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯ ফুট প্রস্থের বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।

ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি থাকবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে, তবে একটি নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি উপজেলা বা থানায় একটি করে বিলবোর্ড স্থাপন করা যাবে।

খসড়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো অন্যান্য আইনগত বিধান ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও বহাল রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement