এক যুগে বজ্রপাতে চার হাজার প্রাণহানি, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

 প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

এক যুগে বজ্রপাতে চার হাজার প্রাণহানি, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন মৌসুমি প্রাকৃতিক দুর্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে জননিরাপত্তার বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। গত এক যুগে দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিন হাজার ৮৬০ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রঝড়ের ধরন বদলে যাওয়ায় বজ্রপাতের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবুও মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি এখনো উদ্বেগজনক।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের হাওরাঞ্চল—বিশেষ করে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, জলাভূমিনির্ভর জীবিকা, কৃষিকাজে দীর্ঘ সময় উন্মুক্ত পরিবেশে অবস্থান এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবের কারণে এসব অঞ্চলে প্রাণহানির হার বেশি।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে ৮২ দশমিক ৪৪টি বজ্রপাত ঘটে। আয়তনের তুলনায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুঝুঁকিতে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের কাতারে রয়েছে বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলোতে বজ্রপাতের ঘনত্ব বেশি হলেও কার্যকর আগাম সতর্কতা, নিরাপদ অবকাঠামো ও সচেতনতার কারণে সেখানে প্রাণহানি তুলনামূলক কম।

বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন, ২০২৫ সালে ২৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত ১৩২ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী বজ্রপাত ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে বর্ষা মৌসুমেও বজ্রপাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু এবং উত্তর দিকের অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ুর সংঘর্ষে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র হতে পারে।

এদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের অনেকগুলোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে প্রায় ছয় হাজার ৭০০টি নতুন বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা এবং সাড়ে তিন হাজারের বেশি ‘কৃষক ছাউনি কাম লাইটনিং অ্যারেস্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে মাঠে কর্মরত কৃষকেরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) বর্তমানে স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হলেও সেই সতর্কবার্তা এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষক ও জেলেদের অনেকের কাছে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় আগাম সতর্কতার সুফল সীমিত হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন আচরণগত পরিবর্তনও। বজ্রধ্বনি শোনা মাত্র খোলা মাঠ, জলাশয় বা উঁচু স্থান ত্যাগ করে দ্রুত পাকা ভবনে আশ্রয় নেওয়া, গাছের নিচে না দাঁড়ানো, ধাতব বস্তু ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকা এবং শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর নিরাপদ স্থান থেকে বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া বজ্রপাত নিয়ে প্রচলিত নানা কুসংস্কারও প্রাণহানির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ জমা থাকে না; তাই দ্রুত উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে সিপিআর প্রয়োগ করলে অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষা করা সম্ভব

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কার্যকর আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে না।

Advertisement
Advertisement
Advertisement