কারামুক্তির পর দেওভোগের নিজ বাসভবনে আইভী, চাইলেন মানবিক সরকার

 প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

কারামুক্তির পর দেওভোগের নিজ বাসভবনে আইভী, চাইলেন মানবিক সরকার

অনলাইন ডেস্ক:

দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দিজীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। গত বুধবার রাত সোয়া ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। কারামুক্তির পর তিনি সরাসরি নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় তাঁর পৈত্রিক বাসভবনে এসে পৌঁছান।

সাবেক এই মেয়রের মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই নারায়ণগঞ্জজুড়ে তাঁর কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাত ১১টা থেকেই দেওভোগে আইভীর বাসভবনের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন তাঁর স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও অনুসারীরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় নেত্রীকে সুস্থ শরীরে ফিরে পেয়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মাঝে স্বস্তি ও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তাঁরা ফুল দিয়ে এবং স্লোগান দিয়ে আইভীকে স্বাগত জানান। এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বাসায় পৌঁছানোর পর সাবেক মেয়রকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাঈদ মাসুদ, আইনজীবী জিয়াউল ইসলাম, শাহীন মাহমুদসহ স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

দীর্ঘ কারাভোগের পর মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী দেশবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, তিনি দেশের বিচার বিভাগের প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন এবং বর্তমান সরকারের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন। একই সাথে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নিজের সুদূরপ্রসারী ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি চান সকলকে নিয়ে দেশে একটি মানবিক সরকার গঠিত হোক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। কারাগারে কাটানো দিনগুলোর অভিজ্ঞতা স্মরণ করে সাবেক এই মেয়র বলেন, জেলে তাঁর মতো অনেক মা আছেন যারা সম্পূর্ণ নিরপরাধ। মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকার তাঁদের প্রতিও সদয় হবে এবং দ্রুত তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


সেলিনা হায়াৎ আইভীর এই দীর্ঘ কারাবাসের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে, যখন পুলিশ নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তাঁকে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ের ৩টি হত্যা মামলা এবং ২টি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আইনি লড়াইয়ের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বেশ কয়েকটি মামলায় তিনি একাধিকবার আদালত থেকে জামিন পেলেও, কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই বারবার নতুন নতুন মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বন্দি রাখা হয়। ফলে দীর্ঘায়িত হতে থাকে তাঁর কারাজীবন। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন লাভ করেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই জামিনের মাধ্যমেই তাঁর কারাগার থেকে বের হওয়ার আইনি পথ চূড়ান্তভাবে উন্মুক্ত হয়। বুধবার রাতে যখন তিনি কারাফটক দিয়ে বের হয়ে আসেন, তখন সেখানে তাঁর আইনজীবী ও পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।


নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী এক অনন্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করা হলে তিনি টানা তিনটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে হ্যাটট্রিক মেয়র হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বিশেষ করে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে দেশজুড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন আইভী। নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সুশাসনের পক্ষে সব সময়ই সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং সাহসী ভূমিকার কারণেই কারামুক্তির পর তাঁর নিজ শহরে ফেরা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এমন ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement