ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নিল গোপালগঞ্জে: বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে একই পরিবারের ৩ জনসহ নিহত ৫

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নিল গোপালগঞ্জে: বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে একই পরিবারের ৩ জনসহ নিহত ৫

প্রতিবেদক,গোপালগঞ্জ:

পবিত্র ঈদ-উল-আজহার অনাবিল আনন্দ আর স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার ব্যাকুলতা মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নিল এক মর্মান্তিক বিষাদে। ঈদের চিরচেনা খুশির আমেজকে এক লহমায় স্তব্ধ করে দিয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ঝরে গেল পাঁচটি তাজা প্রাণ। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুর ঠিক ১২টার দিকে গোপালগঞ্জ শহরের বেদগ্রাম এলাকায় এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং কমপক্ষে ২০ জন যাত্রী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন। উৎসবের দিনে এমন আকস্মিক ও বর্বরোচিত মৃত্যু পুরো এলাকায় এক শোকাবহ ও নিস্তব্ধ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উৎসবের দিনেও মহাসড়কে চিরচেনা যমদূত হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া গতি আর ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা। ঢাকা থেকে পিরোজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা দ্রুতগামী ‘দোলা পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস যখন গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম এলাকা অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেলের সাথে সেটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে যাত্রীবাহী বাসটি মহাসড়কের ওপর সজোরে উল্টে যায় এবং মোটরসাইকেলটি বাসের নিচে ঢুকে সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাসের ভেতরে থাকা প্রায় ৩৫ জন যাত্রীর আর্তচিৎকারে মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধারকাজে হাত বাড়ান।

বাসের মাঝামাঝি সিটে বসে অক্ষত থাকা ভাগ্যকূল যাত্রী মোহাম্মদ জামাল শিকদার সেই গা শিউরে ওঠা মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে জানান, গাড়িটি বেশ দ্রুতগতিতেই পিরোজপুরের দিকে যাচ্ছিল। বেদগ্রাম পৌঁছানো মাত্রই বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল প্রচণ্ড গতিতে সরাসরি বাসের নিচে ঢুকে পড়ে। চালক গাড়িটি বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি, ফলে বাসটি উল্টে গিয়ে ভেতরে থাকা সব যাত্রী একে অপরের ওপর ছিটকে পড়েন। বাসের প্রায় সব যাত্রীই কমবেশি আহত হন এবং চারদিকে শুধু বাঁচার জন্য আকুতি শোনা যাচ্ছিল। অন্যদিকে, মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধুর মর্মান্তিক পরিণতির কথা জানান নিহত সোয়েব শেখের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাহারুল ইসলাম। তিনি জানান, বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার বড়বাড়িয়া গ্রাম থেকে সোয়েব ও শাওন নামের দুই তরুণ সকাল ১১টার দিকে মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি গ্রামে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ‘মহামানব গণেশ পাগলের কুম্ভ মেলা’ দেখার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হয়েছিল। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে মেলায় পৌঁছানোর আগেই বেদগ্রামের মোড়ে তাদের জীবনের চাকা চিরতরে থমকে যায়। নিহত সোয়েব চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, যার মেধা ও ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

এই লোমহর্ষক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন হলেন পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার কলারদোনিয়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে মো. সোহাগ (৩৬), তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন (৩০) এবং তাদের মাত্র ছয় বছর বয়সী অবুঝ শিশুসন্তান মো. আরমান। ঈদের ছুটিতে পরিবারের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে পুরো পরিবারটিই এখন লাশ হয়ে ফিরছে। এছাড়া নিহত বাকি দুজন হলেন মোটরসাইকেল চালক বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শাওন ঢালী (২২) ও আরোহী সোয়েব শেখ (১৬)। ঘটনাস্থলেই মোটরসাইকেলের দুই তরুণসহ চারজন মারা যান এবং গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশু আরমানের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর পরই মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা জানান, আহতদের মধ্যে অঞ্জনা সিকদার, পূর্ণিমা, মিন্টু, তামান্না, ফেরদৌস, রনি, মনির, শান্তা, সাদিয়া, সজিব ও হৃদয়সহ ১১ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাবীবুল্লাহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, দোলা পরিবহনের বাস ও মোটরসাইকেলের এই মুখোমুখি সংঘর্ষের মূল কারণ ছিল চালকদের বেপরোয়া গতি এবং মহাসড়কে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং করার প্রবণতা। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন দুটি উদ্ধার করে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। ভাটিয়াপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নৃপেন কুমার দাস জানিয়েছেন, হাসপাতাল চত্বরেই নিহত পাঁচজনের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহগুলো তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কাজ চলছে। ঈদের দিনের এই মহানিষাদ আরও একবার দেশের মহাসড়কগুলোর নিরাপত্তা ও চালকদের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement