কোরবানির আনন্দ রূপ নিল বিষাদে: পশুর গুঁতা ও ছুরির আঘাতে ঢামেকে শতরানের ছোঁয়া
মহানগর ডেস্ক:
ঈদুল আজহার ত্যাগের মহিমায় যখন চারদিকে উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই অসাবধানতা আর অনভিজ্ঞতার কারণে অনেকের কাছেই এই আনন্দ কিছুটা মলিন হয়ে উঠেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর হাসিল, জবাই ও মাংস কাটার প্রক্রিয়ায় অসতর্কতার দরুন ঘটেছে নানা দুর্ঘটনা। কোরবানির ঈদের প্রথম দিন সকাল থেকেই রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আহত মানুষের ঢল নামে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। গরুর আকস্মিক লাথি, শিংয়ের মারাত্মক গুঁতা কিংবা মাংস কাটার ধারালো অস্ত্রের পোঁচে রক্তাক্ত হয়ে কেবল প্রথম দিনেই প্রায় শতাধিক মানুষ দেশের বৃহত্তম এই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোতে পশু কোরবানির তোড়জোড় শুরু হয়। তবে বিশাল আকৃতির গরুকে বাগে আনতে গিয়ে কিংবা অবাধ্য পশুকে শোয়ানোর চেষ্টা করার সময় অনেকেই মারাত্মক বিপত্তির মুখে পড়েন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আহতদের মধ্যে অন্তত ৮০ জনই এসেছেন গরুর আকস্মিক লাথি ও শিংয়ের গুঁতোয় জখম হয়ে। অন্যদিকে, মাংস কাটার কাজে ব্যবহৃত রামদা, চাপাতি ও চুরির অসাবধান ব্যবহারের কারণে মারাত্মকভাবে হাত-পা কেটে আরও ২০ জন ঢামেকে ছোটেন। আহতদের মধ্যে মাংস কাটতে আসা অপেশাদার মৌসুমী কসাইদের সংখ্যা যেমন ছিল, তেমনি কৌতূহলী পথচারী এবং পশুর মালিকের পরিবারের সদস্যরাও বাদ যাননি।
জরুরি বিভাগের করিডোরগুলোতে সকাল থেকেই ছিল এক আবেগঘন ও ব্যস্ত পরিস্থিতি। রক্তমাখা কাপড়ে স্বজনদের কাঁধে ভর দিয়ে কিংবা স্ট্রেচারে করে একের পর এক রোগীকে ভেতরে নিয়ে আসতে দেখা যায়। চিকিৎসকেরা জানান, আহতদের সিংহভাগের আঘাতই হাত, পা এবং পিঠে ছিল। অনেকের হাড় মচকে গেছে কিংবা ভেঙে গেছে গরুর লাথির তীব্রতায়। তবে আশার কথা হলো, আহতদের বেশিরভাগেরই আঘাত গুরুতর না হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ড্রেসিং শেষে দ্রুতই বাড়িতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে যাদের ক্ষত অত্যন্ত গভীর ছিল কিংবা মাথায় আঘাত লেগেছিল, এমন কিছু রোগীকে জরুরি বিভাগের পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ডে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাদের মূল হাসপাতালে ভর্তি নেওয়ার প্রস্তুতিও রেখেছিল কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ বক্সের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, উৎসবের দিনে সকাল থেকেই জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন ঢামেকে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং এই সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত এলাকা এবং শহরতলির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিকেলের দিকেও আহত রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স কিংবা সিএনজিযোগে হাসপাতালে আসছিলেন।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুশৃঙ্খল কোরবানির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও, পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকেই এড়িয়ে যান। বিশেষ করে হাতির মতো বিশালদেহী পশুকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল বা অভিজ্ঞ কসাইয়ের অভাবই এই ধরনের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। আনন্দঘন একটি উৎসবের দিনে অসতর্কতার কারণে হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। চিকিৎসকেরা উৎসবের বাকি দিনগুলোতেও কোরবানির পশু সামলানো এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণের সময় সবাইকে আরও বেশি ধৈর্যশীল, সচেতন এবং সুরক্ষিত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।