ফটিকছড়িতে বিআরটিসি বাসের চাকায় পিষ্ট বাবা-ছেলে: ক্ষুব্ধ জনতার অগ্নিসংযোগ, রণক্ষেত্র চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক
অনলাইন ডেস্ক:
এক নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে গেল একটি পরিবারের দুটি প্রাণ। সোমবার (১ জুন) সকালে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের ফটিকছড়ি অংশের পাইন্দং আমতল এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহী বাবা ও ছেলে। বিআরটিসি বাসের বেপরোয়া গতির বলি হওয়া এই দুই ব্যক্তি হলেন উপজেলার উত্তর পাইন্দং এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ শাহজাহান ও তাঁর তরুণ ছেলে মুহাম্মদ আরিফ। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা এলাকা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে মুহাম্মদ শাহজাহান তাঁর ছেলেকে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে নিজ গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁরা যখন পাইন্দং আমতল এলাকা অতিক্রম করছিলেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে ধেয়ে আসে একটি দ্রুতগামী বিআরটিসি বাস। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে বাসটি পেছন থেকে সজোরে মোটরসাইকেলটিকে চাপা দেয়। বাসের বিশাল চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই নির্মম মৃত্যু হয় বাবা ও ছেলের। পিচঢালা সড়ক মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে, আর তাঁদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি দুমড়েমুচড়ে বাসের নিচে আটকে যায়।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। চোখের সামনে এমন নির্মম মৃত্যু দেখে ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসেন এবং ঘাতক বাসটিকে আটক করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা বিআরটিসি বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা বাসের আগুনে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। উত্তেজিত সাধারণ মানুষ সড়কে অবস্থান নিলে ব্যাহত হয় সব ধরনের যানচলাচল। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের দুই পাশে সৃষ্টি হয় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট, যাতে আটকে পড়ে শত শত যাত্রী সাধারণ।
খবর পেয়ে ফটিকছড়ি থানা-পুলিশের একটি বড় দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাসচালককে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করতে সক্ষম হয়। এদিকে বাসে আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। প্রায় এক ঘণ্টার নিরলস চেষ্টার পর বেলা ১১টার দিকে বাসের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন তাঁরা। এরপর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ তৎপরতায় সড়ক থেকে পুড়ে যাওয়া বাস ও দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেলটি সরিয়ে নেওয়া হলে ধীরে ধীরে যানচলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
ফটিকছড়ি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শেখ মোহাম্মদ ইয়াসিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। ঘাতক বাসের চালককে ইতিমধ্যেই আমাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে চালকের বেপরোয়া গতি নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ প্রশাসন দ্রুত তদন্ত শুরু করেছে। দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
এদিকে বাবা-ছেলের এমন আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুতে উত্তর পাইন্দং এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামীণ পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, এই সড়কে প্রায়শই দূরপাল্লার বাসগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে, যার খেসারত দিতে হলো আজ দুটি তাজা প্রাণকে। তাঁরা এই রুটে নিয়মিত গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।